বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করুন
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হয় জমির মামলা, জমি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার জন্য ২০২৩ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো ৫৪ জেলায় ভূমি জরিপ (ল্যান্ড সার্ভে) আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার; কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার (২০ মার্চ) সংবাদমাধ্যমে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, ট্রাইব্যুনাল ও আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন হলেও নিয়োগ হয়নি বিচারক। ফলে এসব ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে লাখ লাখ মামলা। দীর্ঘদিন ধরে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিচারাধীন প্রায় চার লাখ মামলার বাদী-বিবাদী মিলিয়ে কয়েক লাখ মানুষ হয়রানির মধ্যে আছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ৫৪ ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের মধ্যে বিচারক নিয়োগ করা হয়েছে মাত্র ১৩টিতে। দীর্ঘদিন ধরে বিচারক নিয়োগ না হওয়ায় ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা জমেছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৭০টি। আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা আছে ৮ হাজার ৫১২টি। আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের দেড় বছর পরও কেন বিচারক নিয়োগ হয়নি তার উত্তর আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন এবং ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর বিচারকের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব আইন থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ৫৪টি ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনালে ৫৪ জন জজসহ সহায়ক কর্মচারীর পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মাত্র ২৬ জন জেলা জজসহ সহায়ক কর্মচারীর পদ সৃষ্টির প্রস্তাব অনুমোদন করে। এখন সেই প্রস্তাব আটকে আছে অর্থ বিভাগে। একইভাবে ১৩টি ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে যুগ্ম জেলা জজসহ সহায়ক কর্মচারী নিয়োগের অনুমোদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দিলেও অর্থ বিভাগ দেয়নি। অর্থ বিভাগের সাড়া মিললে প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদন লাগবে। পরে প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন পাওয়া গেলে পদ সৃষ্টির প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এর পর বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এসব পদে বিচারক নিয়োগ হবে। ফলে সব কাজ শেষ করে চূড়ান্ত নিয়োগ পেতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক হবেন জেলা জজরা। এ ছাড়া প্রয়োজনে সিনিয়র সহকারী জজ বা সহকারী জজদের ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিচারক নিয়োগ দিতে পারবে সরকার। এসব বিধান যুক্ত করে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনটি সর্বশেষ ২০২৩ সালে সংশোধন করা হয়েছে। বিচারকের পদ সৃষ্টির কাজ দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব শেখ আবু তাহের সংবাদমাধ্যমকে বলেন, নিয়মের অতিরিক্ত কিছু হলে সেটা গোপনীয়, এই মুহূর্তে বলা যাবে না। আমরাও চাই এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।
বাংলাদেশের অনেক প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই দেখা যায় একটি বিভাগ আরেকটি বিভাগের দায়িত্ব নিতে চায় না এবং অনেক সময় তাদের কথা থাকে অস্পষ্ট। জমি নিয়ে বিরোধের মামলা অত্যন্ত গুরুতর একটি বিষয়। এর জন্য অনেক সময় খুনখারাবিও হয়। মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত বাদী-বিবাদীরা ঝুলে থাকেন আমৃত্য। অনেক সময় বাদী-বিবাদীর মৃত্যু হলে মামলা আরও জটিলতায় রূপ নেয়। ট্রাইব্যুনাল ও আপিল ট্রাইব্যুনাল যখন গঠনই হলো তাহলে বিচারক নিয়োগ দিতে এত বিলম্ব কেন?
ভুক্তভোগীরা চায় দ্রুত বিচারক নিয়োগ দিয়ে এই মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা হোক। লাখ লাখ মানুষকে এমন ভোগান্তির মধ্যে রেখে রাষ্ট্র সুবিবেচনার পরিচয় দিচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনিক জটিলতা বুঝবেন না, তারা আইনিসেবা না পেলে সরাসরি রাষ্ট্রের দিকেই আঙুল তুলবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠানই সংস্কার হচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে জরুরি নিয়োগদান করা হচ্ছে। এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যত দ্রুত সম্ভব বিচারক নিয়োগদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হোক।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে