পর্ব ১
মূলধারার সংস্কৃতিচর্চা থেকে আমাদের সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে
নাট্যজন মামুনুর রশীদ একাধারে নাট্যকার, অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক। তিনি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মঞ্চ-আন্দোলনের প্রধান পথিকৃৎ। টেলিভিশনের জন্যও অসংখ্য নাটক রচনা ও পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি অভিনয় করেছেন অসংখ্য টেলিভিশন নাটকে। নাট্যকলায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১২ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেও স্বৈরশাসনের প্রতিবাদস্বরূপ তিনি পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করেন। সম্প্রতি তিনি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, শিল্পী-সাহিত্যিকদের অপমান ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ন্যারেটিভ নিয়ে ‘ভিউজ বাংলাদেশ’-এর মুখোমুখি হয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ভিউজ বাংলাদেশের সহযোগী সম্পাদক গিরীশ গৈরিক। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।
ভিউজ বাংলাদেশ: সম্প্রতি আমাদের দেশে প্রকৃত শিল্পী-সাহিত্যিকদের অপমান করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটা কি শুধু রাজনৈতিক ব্যাপার, না কি আমাদের দেশের সংস্কৃতিকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা?
মামুনুর রশীদ: সম্পূর্ণটা রাজনৈতিক ব্যাপার নয়। দীর্ঘদিন ধরেই একটা ষড়যন্ত্র চলছে এখানে এবং তার সঙ্গে অবশ্যই রাজনীতি যুক্ত। রাজনীতির বাইরে কিছু নেই। আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি মূলধারার একটা সংস্কৃতি আছে, সেই মূলধারার সংস্কৃতি থেকে, বিশেষ করে তরুণ সমাজকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা খুব বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে বর্তমান সময়ে এসে। এটা শুরু হয়েছে অনেকদিন ধরেই। আগের সরকারগুলো এটা করেছে। আমাদের গ্রাম বাংলার যে সংস্কৃতির প্রবাহটা ছিল, সেই প্রবাহটা অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে।
আমরা যদি বাউল গানের কথা ধরি। বাউল গান আমাদের মূলধারার সংস্কৃতি। শত শত বছর ধরে আমাদের এখানে বাউল গান চলে এসেছে। সেই বাউলদের একবার চুল কাটা হলো। তার বিরুদ্ধে আমরা প্রবল প্রতিবাদ করলাম। প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হলো না। তাদের কোনো শাস্তি হয়নি। যারা এ ধরনের সহজিয়া গান গায় বা নানান ধরনের গানের সঙ্গে যুক্ত- যেমন যাত্রাপালা ও পালাগান। এসব গ্রাম বাংলায় খুবই জনপ্রিয়। এখন শীতকাল, এখন এর মৌসুম। এই মৌসুমে গ্রাম বাংলার বিভিন্ন জায়গায় এগুলো হতো; কিন্তু বহু বছর ধরে নানানভাবে তাকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। নানা ধরনের শাস্তিও তারা পেয়েছে। তাদের শাস্তি দেয়ার একটা ব্যবস্থা হয়েছে। এটা গেল মূলধারার গ্রামীণ সংস্কৃতির একটা অংশ।
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের এখানে সত্যিকারার্থেই অনেক ভালো লেখক আছেন; কিন্তু ভালো লেখকদের তো প্রকাশক নেই। সেটা একটা সমস্যা। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমাদের যে নাটক এটা একটা জীবন্ত মাধ্যম। ১৯৭২ সাল থেকে আমরা এই নাট্য-আন্দোলন শুরু করেছি, যার ৫২ বছর হয়ে গেল। সারা দেশেই একটা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই আন্দোলনটা আরও বেশি পরিশীলিত হয়ে উঠছে। এখন আরও অনেক নাট্যদল কাজ করছে। গত বছর দেখলাম শুধু ঢাকাতেই ৩৭টি দলের নতুন নাটক নেমেছে। আমাদেরও নতুন নাটক নেমেছে। এই যে ঢাকায় নাটকের একটা প্রবাহ চলছে; কিন্তু সেখানেও দেখা যাচ্ছে যে, ঢাকার বাইরে খুব একটা উৎসাহিত করা যাচ্ছে না। যে-মঞ্চগুলো আছে, অধিকাংশ মঞ্চই একেবারেই অভিনয়-অনুপযোগী। সেগুলো উপযোগী করার চেষ্টা চলেছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে শিল্পকলার ২২টি জেলা শিল্পকলা একাডেমি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একদিকে ভাস্কর্যগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। জাদুঘর, লাইব্রেরিগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। তো এগুলোর আলামতটা কী? আলামতটা হচ্ছে জাতীয় যে সংস্কৃতি, এই সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে অন্যকিছু করা। কেউ কেউ বলে এটা নাকি ‘নিউ ন্যারেটিভ।’
আমি নিজের উদাহরণ দিয়েই বলি। আমি দুবছর আগে বলেছিলাম যে ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ চলছে। রুচির দুর্ভিক্ষ যে শুধু আমাদের পারফরমিং আর্ট- নৃত্যকলা, নাটকের কথা বলিনি। আমি বলেছি যে, মূলত জায়গাটা হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যা কিছু হচ্ছে আপনি যদি একটু চোখ বোলান, দেখবেন সেখানে একটা অপসংস্কৃতির জোয়ার। তারা সিনেমা করে, গান গায়, নাটক নির্মাণ করে। তার মধ্যে অধিকাংশই দেখার মতো না। অশ্লীলতা, নানান ধরনের কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি। সেগুলোর ভিউও হচ্ছে। প্রচুর লোক দেখছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যারা আমাদের রেমিট্যান্স পাঠান, এটা খুবই গৌরবের কথা; কিন্তু তাদের সংস্কৃতির মানটা উন্নত হয়নি। যে কারণে কালকে এক ইউটিউবার আমাকে বলছিল, আমার পুরো মার্কেটটাই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য এবং মালয়েশিয়া।
অনুমান করতে কারোরই অসুবিধা হবে না যে, এখানে তার দর্শক কারা? নাটকের নামও এ ধরনের, দুই স্বামী কেন? গৃহবধূ হলেন বন্ধু, ভাবির সঙ্গে দেবরের সম্পর্ক- এই সমস্ত নানান কিছু দিয়ে খুব অশ্লীল কাজকর্ম হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে আমি প্রশ্ন তুলেছিলাম, দেশে একটা রুচির দুর্ভিক্ষ চলছে এবং দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে আমি চিহ্নিত করেছিলাম- রাজনীতিকে। ব্যস, আমাদের দেশের অনেক প্রগতিশীল লোক, অনেক মধ্যবিত্ত তাদের ফেসবুকে আমাকে নানানভাবে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এনে অপমান করা শুরু করল। এতে লাভ হয়নি। কারণ অধিকাংশ লোকই আমার পক্ষে ছিলেন। এখন তো সবাই স্বীকার করেন যে, ওই কথাটি খুব সঠিক কথা ছিল।
আরেকটি দিক হচ্ছে, সম্প্রতি যেটা শুরু হয়েছে, শিল্পকলা একাডেমিতে বলা হলো আমার একটি নাটক দেশের চারটি জায়গায় অভিনীত হবে, শিল্পকলা এটার ব্যবস্থা করবে; কিন্তু শিল্পকলা কর্তৃপক্ষ বললেন, আমি অভিনয় করতে পারব না। কেন করতে পারব না? কারণ আমি একটা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলাম। বিবৃতিটা ছিল রাজাকার প্রসঙ্গে। এখন তো বলা হচ্ছে, মন খুলে কথা বলুন, যার যা বলার বলুন। তো আমি এটা বলেছি, আচ্ছা ঠিক আছে। স্টেটমেন্ট দিয়েছি। তাতে কী অপরাধ হয়েছে? তাতে যদি আঘাত করে থাকি, কেউ যদি এটাকে অপরাধ হিসেবে মনে করে, তারা তাদের কথা বলুক। সেটা না বলে আমাকে অভিনয় করতে দিবে না। এরপর আমাদের দল থেকে বলা হলো না, উনি না থাকলে আমরা অভিনয় করব না। গেল এটা।
এর পরে আমার যে নাটকটি চলছে এখন ‘কোম্পানি’। নাটক চলতে পারবে; কিন্তু শেষ দৃশ্যটা করতে পারবেন না। কারণ শেষ দৃশ্যে আমি অভিনয় করি। এর পরে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শুধু আমাকে না, সাংবাদিকদেরও বললেন এ কারণে উনি অভিনয় করতে পারবেন না। উনি যে চরিত্রটি করছেন, সেটি একটি ছোট চরিত্র, যে কেউ করতে পারে। উনিও শিক্ষক, আমিও শিক্ষক। আমরা ছাত্রদের পড়াই যে নাটকের কোনো চরিত্রই ছোট চরিত্র নয়। এটা আমাদের কথা না। স্তানিস্লাভস্কির কথা যে, ‘নো ক্যারেক্টার ইজ এ মাইনর ক্যারেক্টার, অনলি দ্য মাইনর অ্যাক্টরস।’ এটা শুনে আমরা বড় হয়েছি। সেই সঙ্গে আমরা ছাত্রদের শিখিয়েছি। ছোট চরিত্র করি বলেই সেটা বাদ দিয়ে আরেকজনকে দিয়ে করান, এই যে প্রবণতা এই প্রবণতাও এক ধরনের অপমানজনক। আরেকটি নাটকের তো প্রদর্শনীই বন্ধ হয়ে গেল। নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়েই সেই প্রদর্শনী বন্ধ করা হলো। এই সমস্যাগুলো হয়েছে চারদিকে। আর শিল্পীর অবমাননা তো চারদিক থেকে হচ্ছে এটা দেখতেই পাচ্ছেন আপনারা।
নাট্যজন মামুনুর রশীদ ও গিরীশ গৈরিক
ভিউজ বাংলাদেশ: বাংলাদেশে শিল্প-সংস্কৃতি জাগরণের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে বলে মনে হয়?
মামুনুর রশীদ: না, পালন করতে পারছে না। শিল্পকলা একাডেমির আগের মহাপরিচালক এবং মন্ত্রীদের সুযোগ পেলেই আমি একটি কথা বলার চেষ্টা করেছি, শিল্পকলা একাডেমি নিজে কোনো প্রযোজনা করে না। পৃথিবীর কোথাও করে না। ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইউএস, আইএস তারাও কিন্তু এক সময় নাটক করত। তারা একটা দল বা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দিত। সারা বিশ্বেই এই নিয়মটা তারা চালু রেখেছে। ভারতে সংগীত, নাটক একাডেমি তারা সবাইকে ফান্ড দেয়। তাদের থেকে প্রস্তাব নেয়, কিন্তু নিজেরা করে না। আমি বলেছিলাম আমাদের দেশে যে সাংস্কৃতিক দলগুলো আছে, যারা স্বাধীনভাবে গড়ে উঠেছে, তাদেরকে আপনারা প্রজেক্ট দেখান, টাকা দেন; কিন্তু নিজেরা করবেন না; কিন্তু তারা নিজেরা করত। এখন অবশ্যই এটা পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। বিভিন্ন দলকে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে; কিন্তু যেটি সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেটি হচ্ছে, ৫২ বছর ধরে নাটকের দলগুলো নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছে।
গত সরকারের আমলে বহুবার আমি বলেছি, একটা স্যালারি গ্র্যান্ড চালু করা হোক। অনেক দেশেই আছে, যারা নাটক করে, দলগুলোকে বার্ষিক একটা অনুদান দেয়, যেখান থেকে শিল্পীরা ভাতা পায়; কিন্তু সেটার কোনো ব্যবস্থা তারা করেনি। আমার মনে হচ্ছে এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও করবে না। একটি নির্বাচন হয়ে গেলেই তারা চলে যাবে। তারপরে যে সরকার আসবে সেই সরকারের কাছেও আমাদের একটা প্রত্যাশা থাকবে; কিন্তু শিল্পকলা সম্পর্কে আমাদের শাসকগোষ্ঠীর আগ্রহ খুব কম। অনেক শাসকগোষ্ঠীই তো আমরা দেখলাম। তারা মনে করে মানুষকে খাদ্যের ব্যবস্থা, কর্মের ব্যবস্থা করলেই হয়; কিন্তু তার পাশাপাশি মানুষের মননশীল বিকাশেরও যে প্রয়োজন আছে সেটা মনে করে না। মননশীল বিকাশের অভাবে আজকের সমাজে দুর্নীতি, অন্যায়, ধর্ষণ বেড়েছে।
নাটকে বা শিল্পকলার অন্যান্য শাখায় আমরা কী করি? সাংবাদিক হিসেবেও আপনাদের দায়িত্বটা কী? দায়িত্বটা হচ্ছে সমাজের যে সংকটগুলো আছে এই সংকটগুলো আমরা নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরি। কেউ নৃত্যকলা, কেউ গান, কেউ ছবি আঁকার মাধ্যমে তুলে ধরেন। তাতে অনেক বক্তৃতা, বই পড়ার চেয়ে এটা খুব বেশি কাজে লাগে। যে কারণে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো একেবারে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে পারফর্মিং আর্ট বা শিল্পকলার বিভিন্ন শাখায় ছাত্রদের উৎসাহিত করে থাকে। সেটার প্রয়োজন আছে। শিল্পকলা একাডেমির এটাই মুখ্য দায়িত্ব; কিন্তু সেই দায়িত্বটা পালন করেনি।
ভিউজ বাংলাদেশ: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর আমরা দেখেছি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বিখ্যাত একজন নাট্যকারকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে। তার অন্তর্ভুক্তির পর আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম শিল্পকলার শিল্পচর্চা বাড়বে। নাটক উন্নত হবে; কিন্তু আমরা দেখেছি, ছোট্ট একটি আন্দোলনের কারণে মাসুম রেজার নাটক বন্ধ হতে। এ বিষয়ে সংস্কৃতির যে অভিঘাতটা তৈরি হলো, তাতে কী ধরনের প্রভাব পড়ল বলে আপনার মনে হয়?
মামুনুর রশীদ: খুব খারাপ প্রভাব পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। ইতিহাসের কাছে দায়ী হয়ে থাকবে তারা এবং এই ঘটনা কিন্তু ঘটিয়েছে মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোক। তারা শিল্পকলা একাডেমিতেই চাকরি করে। বাইরের ভাড়াটে কিছু লোক নিয়ে এই কাজটি তারা করেছে- এটা খুব স্পষ্ট। যখন আমরা এর বিরোধিতা করতে যাই, তখন আমাদের ওপর হামলা হয়। অথচ প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন যে, না-না, নাটক বন্ধ করা যাবে না। নাটকের ওপর হামলা অন্যায়। এটা বলার পর কিন্তু এই ঘটনাগুলো ঘটেছে। যাই হোক, এখন আমরা নাটক করছি। যদিও ঢাকার সব হলে এখনো চালু হয়নি; কিন্তু ঢাকার বাইরে নাটকের অবস্থা খুবই খারাপ।
(চলবে)
আরও পড়ুন
দ্বিতীয় পর্ব
আমরা তো চাই দেশটি রাষ্ট্রহীন না হোক
শেষ পর্ব
দেশে বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে একটা ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছ
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে