বাংলালিংক এর আইএসপি লাইসেন্সের জন্য আবেদন, স্থানীয় আইএসপি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
বাংলালিংক বিটিআরসির কাছে আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছে। সম্প্রতি অপারেটরটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, এরিক অস এই আবেদন করেছেন। বাংলালিংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এই কাজটি পার্টনারশিপ মডেলে করতে চায়।
আবেদনে সিইও এরিক অস বলেন, ‘বাংলাদেশের আইএসপি লাইসেন্সিং নীতিমালার কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের জন্য আইএসপি লাইসেন্স গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যা টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করছে এবং বিশ্বমানের উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করছে।’ তিনি আরও বলেন, এই বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হলে শিল্প খাতে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়ন আরও বাড়বে।
এ ছাড়া, তিনি নীতিমালা অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে টেলিযোগাযোগ খাতে উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর কথা বলেন।
দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল ফোন অপারেটররা তাদের লাইসেন্সের পরিসর বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছে। তারা বলছে, বর্তমান সীমিত পরিসরে কাজ করতে গিয়ে অনেক সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অপারেটরগুলো চাইছে, তাদের সমন্বিত লাইসেন্সের আওতায় সব ধরনের টেলিকমসেবা প্রদান করতে। বিশেষ করে আইএসপি সেক্টরে তারা লাস্টমাইল সেবা দেয়ার দাবি করেছে।
বাংলাদেশে সাধারণত টেলিকম অপারেটররা মোবাইল ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে এবং ইন্টারনেট পরিষেবা সরবরাহকারীরা (আইএসপি) ব্রডব্যান্ড সেবা দিয়ে থাকে।
মোবাইল অপারেটরদের ধীর গতির ইন্টারনেট, উচ্চমূল্যে সীমিত ডাটা এবং আনলিমিটেড প্যাকেজের অভাবের কারণে গ্রাহকরা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দিকে ঝুঁকছেন। দেশে যেখানে গত কয়েক মাসে মোবাইল ইন্তারনেটের গ্রাহকের সংখ্যা কমেছে, সেখানে বেড়েছে আইএসপি ও পিএসটিএন ব্যবহারকারীর সংখ্যা। কম খরচে উচ্চগতির সংযোগ, আনলিমিটেড প্যাকেজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিড বেছে নেওয়ার সুবিধার কারণে ব্রডব্যান্ড জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
তবে দেশের অধিকাংশ এলাকায় এখনো ব্রডব্যান্ডের পর্যাপ্ত বিস্তার হয়নি। বড় শহরগুলোতে এর সম্প্রসারণ বাড়লেও জেলা ও মফস্বল এলাকায় এখনো সেবাটি সীমিত।
এমনিতেই ২০২৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) মোবাইল ফোন অপারেটরদের সেলুলার মোবাইল সার্ভিস গাইডলাইনে এফডব্লিউএ সেবা চালুর অনুমতি দেয়। এর পরেই দেশের তিনটি বেসরকারি মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর ফিক্সড ওয়্যারলেস অ্যাক্সেস (এফডব্লিউএ) সেবা দিয়ে ব্রডব্যান্ড বাজারে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। এফডব্লিউএ সেবার মাধ্যমে গ্রাহককে তার ছাড়াই ওয়াই-ফাই সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে।
এমনিতেই বৈধ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) ব্যবসায়ীরা অবৈধদের দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছে। নিয়মিত কর দিয়েও তাদের ব্যবসার অস্তিত্ব রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে, লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ব্যবসায়ীরা সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চমৎকারভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশের অবৈধ ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার।
সেখানে মোবাইল অপারেটরদের আইএসপি ব্যবসায় প্রবেশের অনুমতি দিলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে পারবে না বলে আশঙ্কা করছেন আইএসপি ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, মোবাইল অপারেটরদের বিশাল মূলধন ও বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেশীয় আইএসপি শিল্পকে সংকটে ফেলবে, যা প্রযুক্তি খাত ও অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল অপারেটরদের এই উদ্যোগ বাংলাদেশে প্রায় ২৫ বছর ধরে গড়ে ওঠা আট হাজার কোটি টাকার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে। প্রতিযোগিতা শুধু অপারেটরদের মধ্যে নয়, নেটওয়ার্ক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্রডব্যান্ড অপারেটরদের মধ্যেও বৃদ্ধি পাবে।
ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি ইমদাদুল হক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, এরকম পদক্ষেপের একটা মারাত্মক প্রভাব পড়বে। আমাদের প্রায় ৬ দশমিক ৫ লাখ কর্মকর্তা কর্মচারী এই খাতে কাজ করে। প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ আছে। এখানে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সব দেশীয় প্রতিষ্ঠান। একটি টাকাও বিদেশে পাচার হয় না। দেশেই সব টাকা থাকে। দেশেই পুর্নবিনিয়োগ হয়। আমার মনে হয় এই ধরনের পদক্ষেপ নিলে সরকারের যে প্রাণচাঞ্চল্যতা এবং প্রতিশ্রুতি তার বিপরীত হয়ে যাবে। আমি মনে করি সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।
গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ISPAB) এর পক্ষ থেকে আমরা মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক কর্তৃক আইএসপি লাইসেন্সের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করার বিষয়ে আমাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।
তিনি আরও বলেন বর্তমানে, দেশে প্রায় ২৭০০ এরও বেশি আইএসপি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করছে এবং লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। মোবাইল অপারেটরদের আইএসপি লাইসেন্স প্রদান করা হলে নিম্নলিখিত নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে:
১. একচেটিয়া বাজার সৃষ্টি: মোবাইল অপারেটররা তাদের উচ্চ বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করবে, যা তাদের এক চেটিয়া ব্যবসায়িক আধিপত্য বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, পক্ষান্তরে গ্রাহকরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই একচেটিয়া বাজার থেকে তার কাঙ্ক্ষিত সেবাটি উচ্চ মূল্যে ক্রয় করতে বাধ্য হবে।
২. স্থানীয় আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার সংকট: কোন আইএসপি প্রতিষ্ঠানই মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না, ফলে এই খাতে ব্যাপকসংখ্যক কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে। উদাহারণস্বরূপ, ভারতের রিলায়েন্স এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তারা স্থানীয় আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলিকে মেরে ফেলার জন্য এক বৎসরের ফ্রি প্ল্যান প্রদান করেছিলো, যার দরুন ভারতের ছোট থেকে বড় প্রায় সকল আইএসপি মাত্র এক বছরের মধ্যেই তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
৩. সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বৃদ্ধি: বর্তমানে বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে ইন্টারনেট সেবার মূল্য সারা-পৃথিবী থেকে কম। মোবাইল অপারেটরদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতে ইন্টারনেট সেবার মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের সাধারণ জনগণ বর্তমানের ন্যায় সুলভ মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
৪. স্থানীয় বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব: আইএসপি খাত বাংলাদেশে একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এই খাতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মোবাইল অপারেটরদের আইএসপি লাইসেন্স প্রদান করা হলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হ্রাস পাবে।
৫. সেবার মানের সম্ভাব্য অবনতি: মোবাইল অপারেটররা ইতোমধ্যে মোবাইল ব্রডব্যান্ড সেবা প্রদান করছে, যেখানে প্রায় সময়ই মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না। এক্ষেত্রে, তাদের আইএসপি লাইসেন্স প্রদান করা হলে সার্বিকভাবে ইন্টারনেট সেবার মানের অবনতি হতে পারে। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নীতিমালার আলোকে, মোবাইল অপারেটরদের মূলত মোবাইল সংযোগ ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান করার অনুমতি রয়েছে। তাদের আইএসপি লাইসেন্স প্রদান করা হলে তা বর্তমান আইন ও নীতিমালার পরিপন্থি হবে।
সুতরাং, বিটিআরসির প্রতি আমাদের আহ্বান এই যে, মোবাইল অপারেটরদের আইএসপি লাইসেন্স প্রদান না করার বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং স্থানীয় আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হোক।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে