অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিতকল্পে ‘ব্যাংক সুপারভিশন বোর্ড’ গঠন করা যেতে পারে
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী আগামী ৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী জানুয়ারি মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কাজেই নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। প্রশ্ন হলো, জাতীয় নির্বাচনের এই ক্রান্তিকালে দেশের অর্থনীতির অবস্থা কেমন হতে পারে বা অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের কোনো সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে কি না। এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো প্রতিষ্ঠানই বড় ধরনের সংস্কারমূলক কার্যক্রম হাতে নেবে না। তারা আগামী সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে। এ মুহূর্তে স্বাভাবিক গতিতে অর্থনীতির হাল ধরে রাখাটাই হবে বড় কাজ।
আমার ধারণা, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যরা সেই কাজটিই করবেন। খুব বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে তারা যাবেন না। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর যাতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা যায় সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করার এখনই উপযুক্ত সময়। আমরা অর্থনীতির কোন দিককে অগ্রাধিকার দেব, কখন সংস্কার কার্যক্রম শুরু করব এসব বিষয়ে এখনই সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং অন্যান্য খাতের এক্সপার্টদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে যারা বিশেষজ্ঞ, তাদের মতামতের ভিত্তিতে স্বল্পকালিন এবং দীর্ঘ মেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে তা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে। আমরা যদি বড় ধরনের সংস্কারে যেতে চাই, তাহলে কোন বিষয়ে এবং কি ধরনের সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করব, তা আমাদের এখনই নির্ধারণ করতে হবে।
এখানে আমি একটি উদাহরণ দিচ্ছি। বর্তমান মুহূর্তে ব্যাংকিং সেক্টরের সবচেয়ে বড় এবং জটিল সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ কালচার। কাজেই ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য কোনো কার্যকর সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে খেলাপি ঋণের বিষয়টি অবশ্যই আসবে। ঋণখেলাপি বিষয়টি কীভাবে ট্যাকেল করা যায়, এ ইস্যুটি নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। কারণ ব্যাংকিং সেক্টরের অনেক সমস্যার মূলে রয়েছে পর্বতপ্রমাণ খেলাপি ঋণের উপস্থিতি। অনেক ধরনের ঋণখেলাপি আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পীড়াদায়ক ঋণখেলাপি হচ্ছে ট্রেড ফাইন্যান্সিং। হয়তো দেখা গেলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এলসি (ঋণপত্র) খোলা হলো; কিন্তু আন্তর্জাতিক কোনো সংকটের কারণেই হোক বা উদ্যোক্তাদের গাফিলতির কারণেই হোক, টাকাটা সঠিক সময়ে দেশে আসছে না। তখন এই টাকাকে ফোর্স লোনে পরিণত করা হয়।
ফোর্স লোন করে কয়েকটি কিস্তিতে ভাগ করে দেয়া হয়। অনেক সময় এই ঋণের অর্থ ফেরত আসে না। তখন সেই ঋণ হিসাবটি খেলাপি হয়ে যায়। এই ইস্যু নিয়ে গভীরভাবে কাজ করা দরকার। সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা এমন কোনো ঋণ দেবো না যেটা ফোর্স লোনে পরিণত হতে পারে। ঋণদানের আগেই ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে এবং ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থাৎ রিস্ক বেইজড অ্যাসেসমেন্ট থাকতে হবে। ব্যাংকগুলোকেও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংককেও এ ব্যাপারে মনিটর করতে হবে। এসব ব্যাপার নিয়ে এখন আলোচনা এবং গবেষণা হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোন শ্রেণির ঋণ বেশি খেলাপি হয়েছে। খেলাপি হবার কারণ কি এসব নিয়ে এখন কাজ করা যেতে পারে। এসব কারণ প্রতিরোধে কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ব্যাংকারদের যদি প্রশ্ন করা হয়, এ ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি হবার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও আপনারা কেন ঋণ দিয়েছিলেন। তখন ব্যাংকাররাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলবেন এ ঋণ প্রস্তাব তাদের বোর্ড মিটিংয়ে অনুমোদিত হয়েছে। রিস্ক ম্যানেজমেন্ট-সংক্রান্ত গাইড লাইন বোর্ড সঠিকভাবে পরিপালন করেনি। ফলে এমন ঋণ দেয়া হয়েছে বা তারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। তখন প্রশ্ন আসবে তাহলে বোর্ডকে কীভাবে তৈরি করা যায় যাতে তারা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নীতি বহির্ভূতভাবে ঋণদানের জন্য চাপ না দেয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগদানের ব্যবস্থা রয়েছে; কিন্তু এমন সব ব্যক্তিকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, যাদের অনেকের যোগ্যতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
আবার এমন ব্যক্তিকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, যারা উদ্যোক্তাদের আত্মীয়স্বজন বা অনুগত ব্যক্তি। তারা বোর্ডে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের পক্ষেই কাজ করে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন একটি আইনি ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে যারা বিভিন্ন ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাবেন তারা তাদের মেধা ও যোগ্যতা সঠিকভাবে প্রয়োগ করে ব্যাংকের উন্নয়নে কাজ করতে পারেন। স্বতন্ত্র পরিচালকরাই ব্যাংকের নেতৃত্ব দেবেন। এমনকি তাদের মধ্য থেকেই বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচন করা যেতে পারে। এটা করা হলে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের উপস্থিতি অনেকটাই কমে যাবে। আমি মনে করি, জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এখনই এ ব্যাপারে প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো করার সময়। এটা করা হলে আগামীতে যারাই নতুন সরকার গঠন করুক না কেন, তখন দ্রুত এসব সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা যাবে।
এই সংস্কার কার্যক্রমের প্রস্তুতি শুরু করাটা শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের একার দায়িত্ব নয়। এর সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়কে যুক্ত হতে হবে। জাতীয় সংসদকেও যুক্ত হতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি নতুন আইনের খসড়া পাস করার জন্য সংসদে উপস্থাপন করা হয়; কিন্তু দেখা গেল, একজন সংসদ সদস্য হয়তো কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় এমন একটি প্রস্তাব দিলেন, যা এতদিনের পরিশ্রমকে শেষ করে দিলো। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংস্কারের ক্ষেত্রে আমরা এ বিষয়টি লক্ষ্য করলাম। এ ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক অঙ্গিকার থাকতে হবে। এতদিন যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি আইনের খসড়া প্রণীত হয়েছে, তা যেন কেউ কলমের খোঁচায় শেষ করে দিতে না পারেন। আমাদের দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেকটাই দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে যতটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা পারে না। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে কোনো গুরুতর অপরাধ বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না। অবশ্য আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম, তখন আমরা হাল ছেড়ে দিইনি। যেখানে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাতাম। অর্থ মন্ত্রণালয় আমাদের প্রস্তাব অবজ্ঞা করত না। এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বড় ধরনের অনিয়ম করছিলেন। সেই অনিয়মের আলোকে আমরা তার বিরুদ্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করি; কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আমরা খুব একটা সাড়া পেলাম না। সময় চলে যাচ্ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছিল। আমরা আবারও অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি লিখি। সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, এ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে আমরা আগেও চিঠি লিখেছিলাম; কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আমাদের এবারের পত্রের আলোকে যদি অভিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তাহলে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারা মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
৪৬ ধরায় বর্ণিত আছে, বাংলাদেশ ব্যাংক জনস্বার্থে যে কাউকে অপসারণ করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে আইনের এ ধারা প্রয়োগ করে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দ্বিতীয় চিঠি দেয়ার পর সেই অভিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বিদায় নিতে হয়েছিল। অভিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোনো জবাবদিহি করেননি। তিনি কার্যত দেশের বাইরে পালিয়ে যান। এখনো তাকে ধরা যায়নি। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা একই রকম হলে ভালো হয়। ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশনের ওপর ন্যস্ত থাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়।
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ‘মানিটারি পলিসি বোর্ড’ বলে একটি বোর্ড আছে। সেখানে সরকারের প্রতিনিধি ছিলেন; কিন্তু শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, মানিটরি পলিসি বোর্ডকে পুরোপুরি স্বাধীন করার স্বার্থে এখানে সরকারের প্রতিনিধি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। তারা সরকারি প্রতিনিধিকে বাদ দিয়েছেন। যদিও এটা খুব সাহসী একটি সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ ব্যাংককেও হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন সাহসী ভূমিকা রাখতে হতে পারে। আমাদের দেশেও এসব ব্যাপারে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মানিটরি পলিসি বোর্ড গঠিত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকোর বাইরে থেকে তিনজন অর্থনীতিবিদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমি মনে করি, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। বাইরে থেকে যে তিনজন অর্থনীতিবিদকে মানিটরি পলিসি বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাদের অনুমোদন ছাড়া প্রস্তাবিত মানিটরি পলিসিতে তেমন কোনো পরিবর্তন করা হবে না বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মানিটরি পলিসির ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে অন্যান্য ক্ষেত্রেও তা প্রসারিত করা উচিত। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের বিষয়টি দেখার জন্য এ ধরনের একটি বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক সুপারভিশন বোর্ড গঠিত হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এই বোর্ডের সভাপতি থাকবেন।
এ ছাড়া একজন ডেপুটি গভর্নর ও একজন নির্বাহী পরিচালক এই কমিটির সদস্য থাকবেন। আর বাইরে থেকে আরও কয়েকজন এক্সপার্ট থাকতে পারেন। আগামী দিনের জন্য আমরা এমনসব গণমুখী সংস্কারের কথা ভাবতে পারি। ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা যাবে, যদি সত্যি সত্যি যোগ্যতাসম্পন্ন স্বতন্ত্র পরিচালকদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। একইভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে উপযুক্ত এবং সঠিক ব্যক্তিদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। রাজনৈতিক সরকার তার পছন্দের মানুষকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিয়োগ দেবেন, এতে দোষের কিছু নেই; কিন্তু তাই বলে অযোগ্য কোনো ব্যক্তিকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডে নিয়োগ দেয়া কোনোভাবেই সঙ্গত হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি তালিকা তৈরি করতে পারে কারা বিভিন্ন ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারেন।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।
অনুলিখন: এম এ খালেক।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে