ফুটবলার হামজার বাবার বিশেষ সাক্ষাৎকার
ছোটবেলার স্মৃতির টানেই বাংলাদেশে হামজা
আগামী ২৫ মার্চ শিলংয়ে এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে ভারতের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। এই ম্যাচে খেলার জন্য ইংল্যান্ড থেকে উড়ে ১৭ মার্চ বাংলাদেশে এসেছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে খেলা দেওয়ান হামজা চৌধুরী। তার আগমন উপলক্ষে দেশের ফুটবল অঙ্গনে অনেক আনন্দ-উচ্ছ্বাস। হামজার পৈতৃক নিবাস হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার স্নানঘাটেও উৎসবের আমেজ বইছে। ১৬ মার্চ স্নানঘাটের নিজ বাড়িতে বসে হামজার বাবা দেওয়ান গোলাম মোর্শেদ চৌধুরীর একান্ত সাক্ষাৎকার নেন ক্রীড়া প্রতিবেদক এম এম মাসুক। এ সাক্ষাৎকারে হামজার শৈশবের স্মৃতি, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচসহ নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। কথোপকথনের গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু তুলে ধরা হলো-
ভিউজ বাংলাদেশ: আপনি তো বাড়িতেই আছেন?
গোলাম মোর্শেদ: এমনি আমি ফেব্রুয়ারিতে দেশে আসি। ফেব্রুয়ারিতে আমাদের বাড়িতে পুরোনো রেওয়াজে সিন্নি, ওয়াজ মাহফিল হয়, আমরা পূর্বপুরুষ থেকে করে আসছি। এ জন্য প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে আমি দেশে আসি। অনেক কিছুর ব্যবস্থা করতে হয়। এবার আর যাওয়া হয়নি। কারণ হামজাও তো আসবে। এ জন্য থাকা আরকি।
ভিউজ বাংলাদেশ: হামজা এ নিয়ে কতবার দেশে আসছে?
গোলাম মোর্শেদ: অনেকবার, হিসাব নেই। ওকে আমি প্রতি বছরই নিয়ে আসি। কোনো সময় দুবার, কোনো সময় একবার আমি সঙ্গে করে নিয়ে আসি। সর্বশেষ ২০১৪ সালে দেশে এসেছিল সে।
ভিউজ বাংলাদেশ: হামজার ফুটবলার হওয়ার গল্পের শুরুটা যদি বলতেন...
গোলাম মোর্শেদ: যখন তার ৫ বছর বয়স, তখন থেকেই সে খেলাধুলা করত। আমরা তখন লাফফোরাতে (ইংল্যান্ড) থাকতাম। সে খেলার মধ্যে ভালো ছিল। খুবই এনার্জেটিক ছিল। বিভিন্ন ক্লাব এসে তাকে দেখেছে। তাকে নেয়ার চেষ্টা করছে। যেমন নটিংহ্যাম ক্লাব আসছে, লেস্টার সিটি ক্লাব আসছে, ডার্বি ক্লাব আসছে। লেস্টার আমাদের কাছে। যে কারণে লেস্টারে সে খেলে।
ভিউজ বাংলাদেশ: আপনারা মা-বাবা হিসেবে হামজাকে কি ফুটবলার হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন?
গোলাম মোর্শেদ: ফুটবলার হওয়ার জন্য তাকে আমরা খেলাতে পাঠাইনি। কারণ আমার প্রত্যেকটি বাচ্চা খেলাধুলা করে। হামজাসহ আমার তিন ছেলে, এক মেয়ে। তারা প্রত্যেকেই খেলাধুলা করত। কেউ ফুটবল খেলে, ক্রিকেট খেলে, ব্যাডমিন্টন খেলে, আরচারি খেলে। হামজা সবার বড়। আমার মেয়ে ডাক্তারি পড়ে ফাইনাল ইয়ারে। আমার বাচ্চারা সবাই বাঙালি, মুসলমান, সবাই খেলতে ভালোবাসে। সবার মধ্যে স্বাধীনতা আছে। তবে তারা ধর্মীয় অনুসরণটা ঠিক মতো করছে। আমি সবাইকে মাদ্রাসায় পড়িয়েছি। আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত করিয়েছি। হামজাকেও তাই। তবে সবার মধ্যে হামজাই ভালো বাংলা বলতে পারে। আর বাকিরা হামজার মতো বাংলা বলতে পারে না। তাদের চেয়ে হামজা একটু ভালো পারে। এটা সিলেটি বাংলা আরকি। এর কারণ হামজা বেশি এসেছে, বেশি থেকেছে। গ্রামে খেলাধুলা করেছে। ক্ষেতে-খামারে ঘুরেছে। আমি ওকে নিয়ে আসলে তো ৬ মাস, ৩ মাস থাকতাম।
ভিউজ বাংলাদেশ: অন্যবারের আসার চেয়ে হামজার এবারের আসার পার্থক্যটা কী?
গোলাম মোর্শেদ: অবশ্যই বেশ কম আছে। আগে তো সে ওই রকমের ফুটবলার হয়নি। যখন সে প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলে খেলছে, তখন তাকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি; কিন্তু নিরাপত্তার অভাবের কারণে নিয়ে আসিনি। এবার বাংলাদেশের হয়ে খেলার জন্য এসেছে। একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আসছে। তবে এবারের আসাটা ভিন্ন রকমের। যে কারণে এত আমেজ, মানুষের টান। এমনিতেই হামজার ভক্ত ছিল বাংলাদেশের মানুষ। খেলার কারণেই হামজার ভক্ত। ইংল্যান্ডের মানুষও হামজার ভক্ত। ইংল্যান্ডের মানুষ ফুটবলপ্রেমী। ফুটবলারদের ভালোবাসে। এবারের আসাটা তো দেখছেনই ভিন্ন রকমের। কারণ বিরাট উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে হামজা আসছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের জন্য খেলবে, ভারতের বিপক্ষে। যদি বাংলাদেশের জন্য খেলে জয় ছিনিয়ে আনতে পারে, তাহলে আরও কিছু হবে। সবার মনের প্রত্যাশা যে, হামজাসহ খেললে ভারতের বিপক্ষে জিততে পারে বাংলাদেশ।
ভিউজ বাংলাদেশ: এবার ভিন্ন আমেজের মধ্যে হামজা আসছে। মানুষের প্রতিক্রিয়া কী দেখছেন?
গোলাম মোর্শেদ: আমি বাড়ি থেকে কম বের হই। আত্মীয়স্বজনের বাসায় যাই। মানুষ আসে, দেখা করে। মানুষের খুবই উৎসাহ, আনন্দ। প্রকাশ করার মতো না যে মানুষ এত খুশি।
ভিউজ বাংলাদেশ: হামজার নিরাপত্তার ব্যাপারে কতটা নিশ্চয়তা পেলেন?
গোলাম মোর্শেদ: এখন কঠোর নিরাপত্তা থাকবে। প্রটোকল থাকবে। পুলিশ সব মনিটর করছে। পুলিশ সব সময় থাকবে। আর বাড়িতে তো বেশি দিন থাকবে না। মাত্র এক রাত থাকবে। বিমানে ঢাকায় যাবে হামজা। তবে সে সড়কপথে যেতে পছন্দ করত; কিন্তু রাস্তা ভালো না। সে আমাকে বলছে, ট্রেনে যাব কি না?
ভিউজ বাংলাদেশ: হামজার আগমন উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে কী কী আয়োজন করা হয়েছে?
গোলাম মোর্শেদ: পারিবারিকভাবে নানা আয়োজন তো আছে। ছেলে বউ আসবে। তার জন্য আয়োজন করা হচ্ছে। গেট বা অন্যসব যে করা হয়েছে, হামজার বউ আসবে তো, এ জন্যই এমন আয়োজন। হামজার বউ মুসলিম, তবে ইংলিশ। তার তিন সন্তান। দুই ছেলে এক মেয়ে।
ভিউজ বাংলাদেশ: বাংলাদেশের হয়ে খেলার চিন্তাটা প্রথম কে তার মাথায় দিয়েছে?
গোলাম মোর্শেদ: বাংলাদেশ থেকে অনেকে বলেছে, হামজা ভাই দেশে আসো, দেশে আসো। এটা হচ্ছে যে, তাকে যে বারবার দেশে এনেছি, দেশে যে খেলাধুলা করত, তার সঙ্গে অনেকেই খেলত, হাওরে গিয়ে খেলত, বাড়িতে খেলত- এই যে দেশে তার ছোটকালের স্মৃতি, এটাই কারণ। বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবাসে, দেশের প্রতি একটা টান তার। সে বাড়ি খুব মিস করে। এই স্নানঘাটে বাড়িটা, তারা মনে করে যে- এটাই বাংলাদেশ। এক সময় হবিগঞ্জ শহরে বাসা ভাড়া করে তাদের রেখেছিলাম, তারা বলল, আমাদের না বাংলাদেশে নিয়ে যাবা, তুমি কই নিয়ে এসেছো? পরে বাসা ছেড়ে আবার বাড়িতে (স্নানঘাটে) আসতে হয়েছে। এই পুকুরে নামছে, তারা খেলাধুলা করছে, কাদামাটি গায়ে মাখছে, স্বাধীনতা আরকি। কেউই কিছু বলে না। সবাই তাকে ভালোবাসে।
ভিউজ বাংলাদেশ: ইংল্যান্ডের ফুটবলে বেড়ে ওঠা হামজা কি বাংলাদেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে?
গোলাম মোর্শেদ: সে মনে করে যে, মানিয়ে নিতে পারবে। সে বলেছে, কোনো সমস্যা হবে না। বাংলাদেশের কথা যে বলছিলাম, বারবার আসার কারণে বাংলাদেশের প্রতি একটা টান আছে এবং বাংলাদেশ থেকে যে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখছে, এগুলো তারে আমি শোনাইতাম। সে বলত, ইনশাআল্লাহ, একদিন খেলব, একদিন খেলব।
ভিউজ বাংলাদেশ: তাকে বেশি উৎসাহ জুগিয়েছে কে, আপনি না তার মা?
গোলাম মোর্শেদ: তার মা তো উৎসাহ দেয়ার কথা না। কারণ তার মা তো ব্রিটিশ। আমার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর তার বাংলাদেশের প্রতি টান। তার মা দেয়ার কোনো কারণ নেই। সে আমার সঙ্গে বড় হওয়া, আমার সঙ্গে ভালো সম্পর্কের কারণে উৎসাহ পেয়েছে। আমার স্ত্রীও বাংলাদেশ বলতে আমাদের বাড়িই (স্নানঘাট) মনে করে। আমি সবসময় বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতাম। এ জন্য তার টান।
ভিউজ বাংলাদেশ: হামজার খেলা কি স্টেডিয়ামে বসে দেখবেন?
গোলাম মোর্শেদ: হ্যাঁ, আমি হামজার সঙ্গে ঢাকায় যাব। স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখব। আমি, আমার স্ত্রী, ছেলেরা, আমার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী সবাই মিলে যাব। শিগগিরই টিকিট কনফার্ম করা হবে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে