স্মৃতি সমুদ্রে অঞ্জনদার বিদায়
অঞ্জনদা নেই- এই খবরটা হঠাৎ চমকে দিল। অবিশ্বাস্য। বিশ্বাস করা কঠিন যে চলচ্চিত্র নির্মাতা জাহিদুর রহিম অঞ্জন, আমাদের প্রিয় অঞ্জনদা আর আমাদের মাঝে নেই। অঞ্জনদাকে আর দেখব না আজিজ মার্কেটে, শাহবাগে; বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে-সেমিনারে।
অঞ্জনদার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল কেবলই সিনেমাকেন্দ্রিক। একসঙ্গে আমরা প্রচুর সিনেমা দেখেছি। সিনেমা নিয়ে নানান কিসিমের বাহাস করেছি। আমাদের আড্ডায় সিনেমার বাইরে অন্য কোনো আলাপ খুব একটা আসতো না। দুই দশকের বেশি সময় ধরে আমাদের অনিয়মিত আড্ডা হতো। কখনো আজিজ সুপার মার্কেটে, কখনো পরীবাগে, কখনো বাংলামোটরে, কখনো শাহবাগে, কখনো বা ছবিরহাটে বা চারুকলায়।
কখন কী সিনেমা দেখছি, কোন চরিত্র কেমন লেগেছে, ছবির ক্রাফট কেমন লাগলো, ছবির অ্যাস্থেথিক ধরতে পারলাম কি না, ছবির ক্যামেরা, সাউন্ড কেমন ছিল, ছবির লোকেশন কেমন, গল্পের বুনট কেমন ইত্যাদি নানান বিষয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতাম। আড্ডায় লোকসংখ্যা বেড়ে গেলে দ্বিপাক্ষিক সেই আড্ডার মজাটা অনেকটা নিয়মিত বাহাসে রূপ নিত। অঞ্জনদা আমাকে অনেক ক্লাসিকস সিনেমা দেখার পরামর্শ দিতেন।
একদিন অঞ্জনদা বললেন, “শোন যেভাবে হোক ‘হরিবোল’ মুক্তি দে। জিজ্ঞেস করলাম- তুমি ‘মেঘমল্লার’ কোন পদ্ধতিতে সেন্সর ছাড়পত্র নিলা, কও? অঞ্জনদা বলেছিলেন, তুই তো আমার মতো পারবি না। শর্টফিল্ম ফোরামের কাগজ দেখিয়ে একটা চালাকি করছিলাম। তুই চাইলে আমি শর্টফিল্ম ফোরাম থেকে তোরে একটা কাগজ দিতে পারি। দেখ কাজ হয় কি না!”
কইলাম, তোমার কথা তো আগামাথা বুঝতেছি না। তুমি ভাঙায়ে কও, কী করছিলা? অঞ্জনদা কইলো- শোন, তখন পীযুষদা ছিলেন এফডিসিতে। পীযুষদাকে শর্টফিল্ম ফোরামের ওই কাগজ দেখাইলাম। কইলাম, আপনি এফডিসির প্যাডে লিখে দেন এনওসি। দাদা কাহিনী বেশি ঘাটান নাই। ব্যস, কাম হয়ে গেল! তুইও একটা চেষ্টা কর!
অঞ্জনদাকে কইলাম, পীযুষদা তো কবি মানুষ। তোমারে বিশ্বাস কইরা কাম কইরা দিছেন। এখন তো আর পীযুষদা এফডিসিতে নাই। এখন এই কাগজে হবে না ফর সিওর! অঞ্জনদা বললেন, “তাইলে কী করবি? দেখ একবার চেষ্টা করে! আমি কইলাম, না। এই পদ্ধতিটা আমার পছন্দ হইলো না দাদা। তুমি ‘হরিবোল’ প্রসঙ্গ রাখো। তুমি গত সপ্তাহে কোথায় হারাই গেছিলা, তাই কও!”
অঞ্জনদা বললেন, ‘হিসেব করে দেখলাম ঢাকায় বসে আমার স্ক্রিপ্ট আগাবে না। তাই স্ক্রিপ্ট ফাইনাল করতে পাহাড়ে হারাই গেছিলাম।’
- তোমার স্ক্রিপ্ট ফাইনাল হইল?
- মোটামুটি ফাইনাল। কিছু কারেকশন আছে। লোকেশানে গিয়ে করব।
- শুটে যাচ্ছো কবে?
- খুব শীঘ্রই।
‘চাঁদের অমাবশ্যা’ নিয়ে ছিল সেই আলাপ। তারপর দেখা হলেই র সিনেমার টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে আড্ডা হতো। অঞ্জনদা আমাকে ডাকতেন ‘তুই’ বলে আর আমি ডাকতাম ‘তুমি’ করে। খুব আদর করতেন আমাকে। সিনেমার বিষয়ে প্রচুর সাহস দিতেন। বাইরে থেকে অঞ্জনদার ক্ষ্যাপাটে ভাবটা ঠিক বোঝা যেত না; কিন্তু সিনেমার আলাপ জুড়লেই বোঝা যেত সিনেমা নিয়ে তার কত স্বপ্ন, কত দম, কত সাধ!
‘চাঁদের অমাবশ্যা’র একটা টেকনিক্যাল শো করলেন খুব গোপনে। পরদিন জানতে পেরে অঞ্জনদাকে খুব কড়া কথা শোনালাম। অঞ্জনদা বললেন, ‘তুই এখন কই যাবি?’
- কইলাম শাহবাগে যাব।
- দুই ঘণ্টা পর গেলে তোর কোনো সমস্যা হবে?
- না তা হবে না।
- তাইলে চল এই গরমে শ্যালেতে ঢুইকা এসি খাই।
শ্যালেতে বসে ‘চাঁদের অমাবশ্যা’ নিয়ে প্রায় ঘণ্টা দুই আড্ডা দিলাম। বাইরে এসে অঞ্জনদা রিকশা নিয়ে চলে গেলেন ধানমন্ডিতে আর আমি হেঁটে হেঁটে টিএসসি।
আমাদের হুটহাট আড্ডাগুলো এমন ছিল যে সিনেমার বাইরের মানুষরা আমাদের কথাবার্তা আগামাথা কিছু ঠাওর করতে পারতো না। আমরা হয়তো তারকোভস্কি বা কুরোসাওয়া নিয়ে কথা বলছি। কখনো বা কিম-কি-দুক বা মোহসেন মাখ্মলবফ আমাদের বিষয়। কখনো বা সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক নিয়ে আমাদের বাহাস। কখনো বা ইনাররিতু বা আব্বাস কিয়ারোস্তামি, কখনো বা কৌশিক-সৃজিত, কখনো বা আলমগীর কবির-আমজাদ হোসেনদের সিনেমা থাকতো আমাদের আড্ডার বিষয়।
অঞ্জনদার সঙ্গে সেই নিবিড় সিনেমা আড্ডাগুলো আর হবে না। এটা ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসে! যেখানে থাকো ভালো থেকো, দাদা।
রেজা ঘটক: কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে