ইউনূস সরকারের ৬ মাস
ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকা দীর্ঘ হলেও ফিরছে না টাকা
গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর রাজনীতিসহ প্রায় সব অঙ্গনেই পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। বাদ যায়নি অর্থনীতিও। তার অংশ হিসেবে ব্যাংক খাত ঢেলে সাজানোর ‘অঙ্গীকার’ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ১১টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন করে গঠন করেন। উদ্যোগ নেন পুরো ব্যাংক খাত সংস্কারের। ব্যাংক খাত থেকে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার আশ্বাসও দেন তিনি; কিন্তু গত ৬ মাসে পাচার হওয়া অর্থ ফেরতে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তবে এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ৩৭৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২ হাজারের বেশি ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। এসব হিসাবে পাওয়া গেছে ১৬ হাজার কোটি টাকা।
বিএফআইইউ বলছে, সন্দেহজনক লেনদেন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জব্দ করা এসব ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। হিসাবগুলোর বিপরীতে মামলা রয়েছে ১১৫টি। এই পর্যন্ত ৯৫টি চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৬৬ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা জব্দ করেছিল সংস্থাটি। ওই সময়ে মামলা ছিল ১১২টি। সে হিসাবে এক মাসে জব্দ করা টাকার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিন দিন জব্দ করা হিসাবের সংখ্যা যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে জব্দ করা টাকার পরিমাণও; কিন্তু এসব টাকা ফেরতে সরকার তেমন সুবিধা করতে পারছে না। ফলে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বিএফআইইউ সূত্রে জানা গেছে, জব্দ করা ব্যাংক হিসাবগুলোর মধ্যে শেখ হাসিনা, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস-চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আকবর সোবহান ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাবও রয়েছে জব্দের তালিকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র বলছে, জব্দ করা ব্যাংক হিসাবগুলোর মালিকরা ব্যাংক থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ বের করে তা পাচার করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাচার করা অর্থ বা সম্পদ দেশে ফেরত আনতে সরকারের উচিত সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। যেহেতু আমাদের দেশ থেকে পাচারের টাকা ফেরত নিয়ে যাওয়ার উদাহরণ আছে, সুতরাং আমরাও ফেরত আনতে পারব। তারা বলছেন, এগমন্টের দেশগুলো, যাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি আছে, নতুন চুক্তি সম্পাদন করে এবং ইন্টারপোলের সাহায্যে এসব সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এগমন্ড হলো আন্তর্জাতিক গোয়েন্দাদের জোট। এই জোটের সঙ্গে ১৭৭টি দেশ যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশও আছে। তাছাড়া একাধিক দেশের সঙ্গে বিএফআইইউর দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও রয়েছে। বিএফআইইউ বলছে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া সম্ভাব্য সব দেশে ইতিমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরতে সবরকম প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। তবে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানো সময় সাপেক্ষ বলে জানিয়েছেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় তিনি বলেন, পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় প্রয়োজন। তার এই বক্তব্যের পর ‘শঙ্কা’ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, গভর্নরের মেয়াদ চার বছর। ইতিমধ্যে তিনি ৬ মাস অতিবাহিত করেছেন। তার হাতে সময় আছে আর সাড়ে তিন বছর। আর পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের কাজে নেতৃত্ব দানকারী সংস্থা বিএফআইইউ প্রধানের মেয়াদ রয়েছে ২ বছর। বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মেয়াদের মধ্যে অর্থ ফেরত না আনা গেলে পরে গতি নাও থাকতে পারে।
এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত আনতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরও যেসব দেশে বাংলাদেশের মন্ত্রী-এমপি, আমলারা অবৈধভাবে অর্থ পাচার করে জমি, ফ্ল্যাট কেনাসহ নামে-বেনামে বিভিন্ন কোম্পানি গড়ে তুলেছেন; তাদের তথ্য সংগ্রহ ও পাচারকৃত সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সরকারি দপ্তরগুলো মাঠে নেমেছে।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, নতুন গভর্নর বিচক্ষণ অর্থনীতিবিদ। পাচার হওয়া অর্থ যদি ফেরত আনা সম্ভব হয়, তাহলে তার হাত দিয়েই হবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের সব পক্ষ যেমন- দুদক, এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতাও প্রয়োজন হতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সম্প্রতি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা খুবই কঠিন। এখন পর্যন্ত যে দেশগুলোর কাছে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় চুরি যাওয়া সম্পদ ফেরত আনতে সহায়তা চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব দপ্তরের ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যানের নেতৃত্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিদল সম্প্রতি ঢাকায় তার সঙ্গে দেখা করলে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে দেশটির সরকারের সহায়তা চান প্রধান উপদেষ্টা।
অ্যাঙ্গোলা যদি ১৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত পেতে পারে। তাহলে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে আমরাও ২৩৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত আনতে পারব। জানা গেছে, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফেরত আনা এবং ব্যবস্থাপনার জন্য গত ২৯ সেপ্টেম্বর সরকার আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করেছে। এই টাস্কফোর্সের সভাপতি করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে। আর টাস্কফোর্সকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে বিএফআইইউ।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে