লক্ষ্য নির্ধারণ ও ইতিবাচক মানসিকতা
খেলা, খেলোয়াড় ও সংগঠক নিয়ে ভাবাবেগ উসকে দেয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। এটি ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ক্ষতিকর। বিভাজন আর বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক সৃষ্টি ক্রীড়াঙ্গনে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে দুর্বল করে। বৈচিত্র্যপূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ক্রীড়াঙ্গন শুধু সৌন্দর্য নয় এটাই প্রত্যাশিত। ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং পদক্ষেপকে না বুঝে, চিন্তা-ভাবনা না করে ঝাঁপিয়ে পড়াটার মধ্যেই নেতিবাচক মানসিকতা প্রশ্রয় পায়। যেসব ঘটনা ঘটলে লক্ষ্যের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে সে সব ঘটনার সম্ভাবনায় আকাঙ্ক্ষিত হয়ে থাকার নামই উদ্বেগ।
মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে নীতি, অধিকার এবং আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য। ইতিহাসের পালা বদল হয়েছে। আমরা যারা ১৯৭১-এর তরুণ ছিলাম সবার মনে এক পরিপূর্ণতার অনুভূতি হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারা সবাইকে একটি গৌরব ও আত্মমর্যাদা দিয়েছে। দুঃখের বিষয় মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনা এবং মূল্যবোধকে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কেন এত বছর পরও ন্যায় পরায়ণ ও সমতাভিত্তিক ক্রীড়াঙ্গনের অভিজ্ঞতা থেকে জাতি বঞ্চিত এই প্রশ্নের উত্তর তো দিতে হবে নতুন প্রজন্মের কাছে। নতুন প্রজন্ম তো চায় নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্রীড়াঙ্গন। বর্তমানে ক্রীড়াঙ্গনে আমাদের অবস্থান কোথায়- এই প্রসঙ্গ অর্থহীন। আমরা কোন লক্ষ্যে যাত্রা করতে চাচ্ছি সেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্ম চায় ক্রীড়াঙ্গনের মধ্যে দেশকে দেখতে।
আমাদের উল্টোপাল্টা চিন্তা-ভাবনা, পরশ্রীকাতরতা, ক্রীড়াঙ্গনকে ঘিরে ‘মেকি’ আত্মতৃপ্তি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ক্রীড়াঙ্গন ব্যক্তি সমষ্টি আর তথাকথিত ‘সিন্ডিকেটের’ কাছে তো সব সময় জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না। দেশটা তো সবার স্বপ্ন ঘেরা। ক্রীড়াঙ্গনও তাই। লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি টেকসই ভালো ক্রীড়াঙ্গন। খেলোয়াড়-ক্রীড়াবিদরা ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, কাবাডি, আর্চারি, শুটিং এবং অন্যান্য যে খেলায় যখনি ভালো করবে সেই আনন্দ তো সবাই মিলে এক সঙ্গে উপভোগ করার কথা।
দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। ফুটবলে আছে বাঙালির সুমহান ঐতিহ্য এবং অতীত। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বাঙালির ফুটবল দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডিতেও দারুণভাবে পিছিয়ে আছে। গত বাইশ বছরেও দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে শিরোপা জয় অধরা থেকে গেছে। এই আঞ্চলিক ফুটবলে যদি বাফুফে নতুন চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে ভালো করার উদ্যোগ নিয়ে সফল হয় - তাহলে তো এটি হবে দেশের ফুটবলে নতুন জাগরণ। আর এই জাগরণ বাংলাদেশের ফুটবলকে বিভিন্নভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাফুফে উদ্যোগ নিয়েছে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি ফুটবলার যারা ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশে আছেন তাদেরকে স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের মেধা এবং সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। এটি আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশে দেশে নতুন কোন কিছু নয়।
ফিফার অনুমতি স্বাপেক্ষে ইউরোপ, আফ্রিকা, ল্যাতিন আমেরিকা এবং এশিয়া মহাদেশের মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন খেলোয়াড়রা বিভিন্ন দেশের হয়ে। অনেকে খেলছেন নাগরিকত্ব পরিবর্তন করে। সম্প্রতি জন্মসূত্রে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া এবং খেলানোর উদ্যোগে বিরোধিতা এবং বিতর্ক সৃষ্টির পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। কেনো সংকীর্ণ চিন্তা-ভাবনা থেকে বের হয়ে এসে দেশের বৃহত্তর ফুটবলের স্বার্থের কথা ভাবছেন না ফুটবল সংশ্লিষ্ট একদল। বাঁকা চোখে সস্তা প্রচারণার খেলায় কেউ কেউ মেতে উঠেছেন। এটি দুঃখজনক। ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সমস্যার সমাধান তথা ‘এএফসি লাইসেন্স’ নিশ্চিত করতে পারেনি গত দুবছর দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও জনপ্রিয় ক্লাব।
যারা ‘পাবলিক খাওয়ানোর’ খেলায় মেতে উঠেছেন তারা তো এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার নন। দেশের হয়ে খেলতে আসলে দেশের ফুটবল ধ্বংস হয়ে যাবে-এটি কেমন কথা। আন্তর্জাতিকমানের খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তি মানে বিশ্ব ফুটবল মিডিয়ায় বাংলাদেশের ফোকাস। স্থানীয় খেলোয়াড়রা আলোকিত হবেন। তাদের জন্য খুলে যাবে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। আমরা চাই ফুটবল প্রাক্তন খেলোয়াড় এবং খেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের কাছ থেকে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তির প্রয়োগ। ফুটবল মুক্ত হোক নির্বুদ্ধিতা থেকে। মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
বাফুফের বর্তমান গভর্নিং বডির প্রতি আস্থা রেখে অনেক বছর পর ফিফা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়েছে। অসম্মান এবং বিব্রতকর অবস্থা থেকে মুক্তি মিলেছে। আর্থিক সুশাসন, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হোক বর্তমান কমিটির প্রতিশ্রুতি। বাফুফে এখন পারবে ফিফার কাছে স্পেশাল প্রজেক্টের জন্য আবেদন করতে। আর্থিক ব্যবস্থা খাতে অনিয়মের পরিণাম কত খারাপ হতে পারে এতগুলো বছর ধরে সবাই টের পেয়েছেন। ‘ন্যাড়া বেলতলায়’ গেলে কি হতে পারে এই অভিজ্ঞতা ফুটবল সংগঠকদের হয়েছে। আলোর পথযাত্রী একজন প্রবীণ ফুটবল সংগঠক বলেছেন মানসিকতায় পরিবর্তন আসলে অনেক কিছুই সহজ হয়ে যাবে।
ক্রিকেট একে একে পাঁচটি উজ্জ্বল দেউটি নিভে গেছে বলা যায়। বর উঠেছে হায়, হায় কি হবে। আর এই রব ওঠার পেছনে কারণ হলো ক্রিকেট বোর্ড ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, লক্ষ্য নির্ধারণ করে তো কাজ করেনি। কোনো খেলোয়াড় তো সব সময়ের জন্য নয়, তাকে তো এক সময় সরে যেতেই হবে, তার শূন্যস্থান পূরণের জন্য স্বল্পমেয়াদি মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি যে কাজটি করার কথা ঋণমুক্ত ও ধনী ক্রিকেট বোর্ড সেই কাজটি করেনি। তারা শুধু ফোকাস করেছে স্বল্প সময়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। আর তাই মনে হচ্ছে মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়বে। মিডিয়া দারুণ সোচ্চার। ঠেলাঠেলি আর দোষারোপের স্টোরির পানে দারুণ বাতাস। অথচ সময় থাকতে যদি চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ করা হতো, তাহলে ব্যাপারটা হতো অন্য দেশের ক্রিকেট বোর্ডের মত।
বলা হয় নতুন করে দল পুনর্গঠনের কাজ চলছে। কিছু সময় লাগবে পুরোপুরি ‘সেট’ হতে। ক্রিকেট বোর্ড ক্রিকেটের উন্নতির জন্য উল্লেখ করার মতো কাজ করেনি। ক্রিকেট তো জুয়া খেলা নয়। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক বর্তমানে ক্রিকেট বিশ্লেষক ও ধারা ভাষ্যকার নাসির হুসেইন বলেছেন ‘বাংলাদেশ ১৫ বছর আগে যা ছিল তাই আছে, আর এই ১৫ বছরে আফগানিস্তান যেভাবে এগিয়েছে এটি উল্লেখ করার মতো। তারা যদি এই টেম্পার ধরে রাখতে পারে তা হলে ক্রিকেটে বিশ্ব বিজয়ী হতে তাদের সময় লাগবে না।’
এদিকে গত ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন ফাহিম কালের কণ্ঠকে বলেছেন ‘পুরোনোদের যেতেই হবে। গত কিছুদিন আমরা কিছু খেলোয়াড়কে দেখেছি, যারা যথেষ্ট যোগ্যতা রাখে জাতীয় দলে খেলার। সংবাদ মাধ্যমে দেখি অনেকের কথা উঠে আসে, এ কেন দলে নেই, ও কেন দলে নেই। এর মানে যারা চলে যাবে, তাদের বিকল্প আমাদের হাতে আছে। নতুনদের ওপর আস্থা রাখলে তামিম-মাহমুদদের বিকল্প পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন নাজমুল। তার কথা হলো যদি মনে করি নতুন যারা আসছে তারা যোগ্য নয়, যারা চলে যাচ্ছে তাদের মতো কোনোদিন হওয়া সম্ভব নয়, তা হলে আমার মনে হয় না আর কোনোদিন নতুন খেলোয়াড় উঠে আসবে না, আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, যারা নতুন তারাও ভালো। এবং বিশ্বাস করতে হবে যোগ্য হিসেবেই তারা এখানে এসেছে।’
মেহেদী হাসান মিরাজ বলেছেন, মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লারা দেশের ক্রিকেটকে দীর্ঘ অনেক বছর সার্ভ করেছেন, তারা খেলাটিকে একটি ধাপে নিয়ে গেছেন। আমাদের কাজ হবে খেলাটিকে আরেক ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ এতো বছরেও বড় ট্রফি জিততে পারেনি। বড় ট্রফি জিততে পারলে দেশের ক্রিকেট শুধু অনুপ্রাণিত হবে না অল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। জয় শুধু অনুপ্রাণিত করে না, আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। রাইট ডিরেকশনে ক্রিকেট চলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মিরাজ আমাদের ক্রিকেটে আগামী দিনে অনেক বড় আশা- তার কথায় আলাদা গুরুত্ব আছে। আগামী দিনের ক্রিকেটকে অন্যভাবে দেখার প্রত্যাশা।
ইকরামউজ্জমান: কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার ফুটবল এশিয়া।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে