Views Bangladesh Logo

আমি কাজ করতে করতেই মারা যেতে চাই

Abul  Hayat

আবুল হায়াত

বুল হায়াত, বাংলাদেশের মানুষ যাকে এক নামেই চেনেন। সেই স্কুলজীবন থেকে তিনি অভিনয় শুরু করেছিলেন, আজও অভিনয় করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে তিনি অভিনয় করছেন। আমাদের মঞ্চ নাটক, বেতার নাটক, টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্রের যাত্রা তার ও তার বন্ধুদের হাত ধরেই হয়েছে। তিনি এবং তার সমকালীন বন্ধুরাই আমাদের অভিনয়শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের কমপক্ষে তিনটি প্রজন্ম বড় হয়েছে তাদের অভিনয় দেখে।

আবুল হায়াতের কালজয়ী টেলিভিশন নাটকগুলোর মধ্যে আছে- এইসব দিনরাত্রি, অয়োময়, বহুব্রীহি, নক্ষত্রের রাত, আজ রবিবার, আকাশের ওপারে আকাশ ইত্যাদি। তিনি প্রায় শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলো হলো- অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, তিতাস একটি নদীর নাম, বধূ বিদায়, আগুনের পরশমণি, স্বপ্নের ঠিকানা, জয়যাত্রা ইত্যাদি। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু নাটক পরিচালনাও করেছেন। লেখালেখিও করতেন এক সময় নিয়মিত। গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি পত্রিকায় কলাম লিখতেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনী- ‘রবী-পথ’।


বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি এতই জনপ্রিয় যে, তার ও তার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলা বাতুলতামাত্র। ভিউজ বাংলাদেশের ঈদ আয়োজনে আমাদের সঙ্গী হয়েছেন বাংলাদেশের এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তার দীর্ঘজীবনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন কামরুল আহসান

ভিউজ বাংলাদেশ: আপনার অভিনয়জীবন ৭০ বছরের ওপরে। এই দীর্ঘযাত্রায় আপনি কোত্থেকে কোথায় এসেছেন ভাবলে কেমন লাগে!

আবুল হায়াত: ১০ বছর বয়সে নিজে মঞ্চ বানিয়ে অভিনয় করেছি। তারপর থেকে যেখানে সুযোগ পেতাম সেখানেই অভিনয় করতাম। স্কুলে। পরে মঞ্চে এসে অভিনয় শুরু করলাম। সেখান থেকে বেতারে, টেলিভিশন নাটকে, সিনেমায়। এক সময় প্রচুর বিজ্ঞাপনও করেছি, মোটামুটি তারকাই ছিলাম বিজ্ঞাপন জগতে। অভিনয়ের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে অভিনয় করিনি। ভাবলে অবাকই লাগে কোত্থেকে কোথায় এসেছি। এক সময় খুব ব্যস্ত শিল্পী ছিলাম। প্রতিদিন কাজ থাকত। মাসে ৩০ দিনই শুটিং। এই আলমারি দুটি ভর্তি আমার শুটিং কস্টিউম। এখন তো আর তেমন কাজ করি না। মাঝে মাঝে এগুলো দেখি। বেশিরভাগ সময় আমি এ ঘরেই বসে থাকি। লিখি। পড়ি।

ভিউজ বাংলাদেশ: এখন অভিনয় কমে গেছে, ব্যস্ততা কমে গেছে, এই সময়টা কেমন লাগছে?

আবুল হায়াত: এটাও প্রত্যাশিত। জীবনে এটা ঘটবেই। সব সময় শারীরিক সক্ষমতা আগের মতো থাকে না। এখন আমি চেষ্টা করি নিজেকে যতটা কম কষ্ট দেয়া যায়। তাই ঢাকার বাইরে গিয়ে শুটিং করি না। দুর্গম জায়গায় যাওয়া বাদ দিয়ে দিয়েছি। ঢাকার যে স্টুডিওগুলো আছে সেগুলোতেই কাজ করি। আরেকটা কাজ করি, আগে যেমন পাণ্ডুলিপি তেমন বাছাবাছি করতাম না, এখন বেশ কট্টোরভাবে বাছাই করি। তারপরও ব্যস্ত থাকতে চাই। কাজ করতে চাই। কাজ করি।

ভিউজ বাংলাদেশ: আপনি তো এক সময় পরিচালনায়ও ব্যস্ত ছিলেন। এখনো কি পরিচালনা করেন?

আবুল হায়াত: হ্যাঁ, করি অল্প দু-একটা। এবার ঈদেও আমার পরিচালনায় একটা নাটক প্রচারিত হবে চ্যানেল আইয়ে। আমি পরিচালনার মধ্যে থাকব যত দিন পারি। আমি বলেছিলাম যে, আই ওয়ান্ট টু ডাই অন স্টেজ। স্টেজ বলতে বলতে বোঝাচ্ছি সামগ্রিক কর্মক্ষেত্র। এই কাজ করতে করতেই মারা যেতে চাই।

ভিউজ বাংলাদেশ: অভিনয় ও পরিচালনা ছাড়াও আপনি লেখালেখিতে ব্যস্ত ছিলেন, এখনো কি লিখছেন?

আবুল হায়াত: হ্যাঁ, সেটাও করি। আমার আত্মজীবনী বেরিয়েছে। রবী-পথ। এখন ভাবছি যে ওটার একটা দ্বিতীয় পর্ব লেখা যায় কি না, ওটা নিয়ে বসেছি... আত্মজীবনীর নাম ‘রবী-পথ’ রাখার কারণ আমার ডাক নাম রবী। রবী যে পথটা অতিক্রম করেছে তারই বিবরণ দিয়েছি। আশপাশে অনেক যাত্রী এসেছেন এবং চলেও গেছেন; এই যাত্রা পথটাই রবী-পথ। রবী-পথ শুরু হয়েছে আমার জন্ম থেকে আর শেষ হয়েছে আশি বছর পর্যন্ত এসে; কিন্তু এর আশপাশের অনেক ঘটনাই আমি মিস করেছি, এ ধরনের কিছু ঘটনা এবার দ্বিতীয় পর্বে লেখার চেষ্টা করছি। দ্বিতীয় পর্বের নাম দিয়েছি: আশিতে আসিলাম।


ভিউজ বাংলাদেশ: আপনি তো দীর্ঘ এক পথ পরিভ্রমণ করেছেন। আমাদের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জাগরণের অনেক কিছুই আপনি কাছ থেকে দেখেছেন। রবী-পথে কী কী বিশেষ ঘটনা এসেছে?

আবুল হায়াত: একটা গাছ যেভাবে জন্মায়, গোড়া থেকে একদম আগা পর্যন্ত সোজা বেড়ে উঠা, সেভাবে আমি লিখে গেছি। আশপাশে হয়তো অনেক ডালপালা বাদ গেছে। লিখতে গিয়ে যেগুলো মনে হয়েছে না লিখলেও চলে, সেগুলো বাদ দিয়েছি। লেখার পরও অনেক কিছু দেখে মনে হয়েছে যেগুলো লিখেছি সেগুলো না লিখলেও চলতো। তবে, আমার জীবনীটা পুরোপুরি পাওয়া যাবে।

ভিউজ বাংলাদেশ: তার সঙ্গে আমাদের কালচারাল-হিস্ট্রিও নিশ্চয়ই জানা যাবে।

আবুল হায়াত: হ্যাঁ, আমি কীভাবে নাটকে এলাম, কীভাবে টেলিভিশনে ঢুকলাম, কীভাবে বেতারে এলাম, কীভাবে সিনেমাতে গেলাম, বিজ্ঞাপনে কীভাবে ঢুকলাম হঠাৎ করে- সবই এসেছে। এর সাথে সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের কথাও আছে। আমার পরিবারের কথা আছে। আমার সন্তানদের কথা। নিজের সম্পর্কেই লেখা, কিন্তু তার সঙ্গে অনেক কিছুই এসেছে।

ভিউজ বাংলাদেশ: আপনার আত্মজীবনীতে আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের কারা প্রাধান্য পেয়েছেন?

আবুল হায়াত: বন্ধুরা অনেকেই এসেছেন। এক নম্বরে এসেছেন অমলেন্দু বিশ্বাসের কথা, যার অভিনয় দেখে আমি অভিনয় শিখেছি। তারপর এসেছেন গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ হাসান ইমাম, আবুল খায়ের, সিরাজুল ইসলাম, মাসুদ আলী খান- এই কজন মানুষকে আমি আলাদাভাবে প্রোট্টেট করেছি ছোট ছোট চাপ্টারে।

ভিউজ বাংলাদেশ: হুমায়ূন আহমেদের কথা কি এসেছে?

আবুল হায়াত: আলাদাভাবে আসেনি। যাত্রাপথে যেটুকু আসার সেটুকু এসেছে।

ভিউজ বাংলাদেশ: আপনারা তো এই দেশের সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন। একটা কথা দুঃখের সাথে বলতে হয়, আমাদের এখানে যারা অভিজ্ঞতা অর্জন করে একটা বয়সে পৌঁছে যান, পরবর্তীতে তারা আর কাজ পান না, তাদের একপ্রকার দূরেই সরিয়ে দেয়া হয়। আপনি তো জানেন আমাদের দেশের সিনিয়র অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সেভাবে কাজে লাগনো হয় না। শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রী না, সমাজের ক্ষেত্রেই বোধহয় আমাদের দেশে সিনিয়রদের কিছুটা আউটসাইডার করে দেয়া হয়। এ বিষয়ে যদি আপনি কিছু বলেন।

আবুল হায়াত:
এ বিষয়ে আমি অনেক জায়গায় লিখেছি এবং বলেছিও, যে যখনই আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করি তখনই আমাদের দূরে ঠেলে দেয়া হয়। এটা একেবারেই ঠিক না। এটা একেবারেই ভুল একটা ক্যালকুলেশন। ভুল পরিকল্পনা। যত বয়স বাড়ে মানুষ তত অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তার কাজের ম্যাচিউরিটি আসে, পরিপক্বতা আসে। সেটা যদি কাজে না লাগাতে পারে সেটা একটা ব্যর্থতা। অভিনয়ের ক্ষেত্রে বলো, চাকরির ক্ষেত্রে বলো। যেমন আমেরিকাতে দেখলাম, ওদের চাকরিতে কোনো রিটায়ার্টমেন্ট নাই, যত দিন মন চায়, যতদিন পারো কাজ করো, তুমি বললেই তোমাকে ছেড়ে দেব। এখন অবশ্য আমাদের দেশে কিছুটা পরির্তন এসেছে। সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে অনেকে গিয়ে প্রাইভেট কোম্পানিতে ঢুকছে। প্রাইভেট কোম্পানিগুলোও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগ্রহভরে নিচ্ছে, জানে যে এরা অভিজ্ঞ মানুষ, এদের কাজে লাগবে।

কিন্তু নাটকের ক্ষেত্রে অবস্থাটা বদলায়নি। বয়স হওয়ার সাথে সাথে এখানে কাজ কমতে থাকে। আগে যেমন সারাদিনই আমার দশটা-পাঁচটা অফার আসতো, এখন হয়তো পাঁচ দিন-সাত দিনে একটা অফার আসে। এতে যে আমার খুব অসুবিধা হচ্ছে তা না; কিন্তু আমি তো কিছু দিতে চাই। আমার সারাজীবনের যে অভিজ্ঞতা সেটা আমি কাজে লাগাতে চাই। নতুনদের কিছু দিতে চাই; কিন্তু সেই সুযোগটা আমাদের নেই।

পশ্চিমবঙ্গে আমরা যদি দেখি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে কতরকমভাবে ব্যবহার করা হয়েছে! মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি শুটিং করেছেন। তাকে ভিত্তি করেই গল্প তৈরি করা হয়েছে। নাটক-সিনেমা বানানো হয়েছে। সাবিত্রী চাটার্জি আমার চেয়ে বয়সে বড়, এখনো তিনি অভিনয় করে যাচ্ছেন, তাকে নিয়ে গল্প তৈরি করা হয়, আমাদের এখানে কেন হয় না?
শুনি অনেকে বলে, আপনাদের নিয়ে কীভাবে কাজ করব ভাবি, সাহস পাই না। আরে সাহস পাওয়ার তো কিছু নাই। আমি তো তরুণদের সাথে কাজ করতে আনন্দ পাই। একজন তরুণ পরিচালকের নির্দেশনায় কাজ করতে চাই। আমি দেখতে চাই সে কীভাবে কাজ করে। আমি তো তার কাছ থেকে কিছু পিক করতে চাই। আমি জানি নতুনরা অনেক কিছু শিখে কাজ করতে এসেছে। আমরা তো না শিখে এসেছি। আমরা কাজ করতে করতে শিখেছি; কিন্তু তারা শিখে এসে কাজ করছে এবং ডে বাই ডে তারা উন্নতি করছে।
তো আমরা যেটুকু শিখলাম, যেটুকু অর্জন করলাম সেটুকু তো তোমরা ব্যবহার করতে পারছো না, সেটা তো তোমাদের ব্যর্থতা। এটা তো আমাদের ব্যর্থতা না।

ভিউজ বাংলাদেশ: আমাদের সংস্কৃতির এখন কী অবস্থা মনে হয় আপনার কাছে? কেমন চলছে আমাদের নাটক-সিনেমা?

আবুল হায়াত: আমাদের সংস্কৃতির অবস্থা এখন খিচুরির মতো মনে হয়। খিচুরি তো স্বাদের খাদ্য; কিন্তু খিচুরি যদি রান্নাটা ঠিক না হয় তাহলে তো বিস্বাদ হয়ে যায়। তো কখনো হয়তো আমাদের কিছু নাটক-সিনেমা ভালোও হচ্ছে, সেগুলো মানুষ গ্রহণও করছে; কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাজে খিচুরির মতো অবস্থা।
আগে যেমন পশ্চিমা কালচারের একটা প্রভাব ছিল আমাদের এখানে, সাথে মুম্বের কালচার, এখন বোধহয় কুরিয়ান ফিল্ম-সিরিজও ঢুকছে। এসবের মিশেলে ভালো কিছু কাজও হয়; কিন্তু শিল্পের মূল কাজ বিশ্বাসযোগ্যতা। রুচিশীলতা। সেগুলো কতটা কী হচ্ছে প্রশ্নসাপেক্ষ।

ভিউজ বাংলাদেশ: এই মুহূর্তে আমরা একটু রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি; কিন্তু আপনি তো আশাবাদী মানুষ। আপনি কী দেখেন, আমাদের সামনে কী আছে?

আবুল হায়াত: আমি আশাবাদী মানুষ। আশা-নিরাশাবাদীর একটা প্রতীকী গল্প আছে, একটা গ্লাসের অর্ধেক খালি, অর্ধেকটা ভরা; পেশাগতজীবনে আমি ইঞ্জিনিয়ার ছিলাম- আমি বলি এই গ্লাসটা যতটা পানি ধরেছে তার চেয়ে অনেক বেশি পানি ধরতে পারত! তো আমি এটাই বলি, পানিটা আমরা ভরে ফেলব। এত হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

ভিউজ বাংলাদেশ: আমাদের আজকের আয়োজন মূলত ঈদ নিয়ে। ছোটবেলায় আপনার ঈদের স্মৃতি কী কী মনে আছে?

আবুল হায়াত: প্রথমেই যেটা মনে পড়ে রোজার ঈদে চাঁদ দেখার কথা। আমরা সব ভাইবোন বেরিয়ে যেতাম চাঁদ দেখতে। মাঠে চলে যেতাম, যেখান থেকে চাঁদ দেখা যেত। চাঁদ দেখলেই চিৎকার করতে করতে বাড়ি আসতাম। মাঝে মাঝে আব্বার সাথে তারাবি পড়তে যেতাম। অনেক সময় সবাই সেজদায় চলে গেলে উঠে পালিয়ে আসতাম, কষ্ট লাগতো বিশ রাকাত তারাবি পড়তে। সেসব কথা মনে পড়ে। ইফতারের কথা মনে পড়ে। ছোটবেলায় শখ করে তিনটা-চারটা রোজা রাখতাম, তখন মা আমার জন্য স্পেশাল ইফতারি বানাত। আরেকটা আনন্দ ছিল মসজিদে ইফতারি করা, সারা পাড়া থেকে ইফতার আসতো, সব একসাথে নিয়ে ইফতার খাওয়া। সে এক বিরাট আনন্দের ব্যাপার।

আরেকটা ব্যাপার, ঈদের নতুন জামা। নতুন জামা তো লাগতোই। তখন আমি কালারফুল জামা খুব একটা পছন্দ করতাম না। সাদা বা অ্যাশ কালার হতে হবে। আব্বা বলতো, তুই তো এখনই বুড়া হয়ে গেছিস!  এখন যেমন আবার কালার ভালো লাগে। এখন কালারফুল জামাই বেশি পরি। মেয়েরা আমাকে খুব কালারফুল জামা দেয়।

তো আমরা তখন খলিফার কাছ থেকে জামা বানাতাম। এখন তো বোধহয় খলিফা কী চিনবেও না কেউ। তো আমাদের ইকবাল ভাই ছিলেন, বিহারি খলিফা। কাপড় হয়তো দিয়ে এসেছি দশ-বারো দিন আগে, ইকবাল ভাই বলতেন, রাখ দো, কাল হোয়ে যায় গা, এই কাল গড়াত চানরাত বা ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত! তারপর নামাজের দিন জায়নামাজ বগলে নিয়ে আব্বার সঙ্গে ঈদগাহেে নামাজ পড়তে যেতাম। আব্বা হয়তো দোকানে একটু আতর দিয়ে দিতেন। নামাজ পড়ে এসেই বাড়ি বাড়ি দৌড়াতাম সেমাই খাওয়ার জন্য, সেলামি নেয়ার জন্য। সিকিটা, আধুলিটা পেলে ঈদের খুশি আর ধরে না!

ভিউজ বাংলাদেশ: এখন কেমন উপভোগ করেন ঈদের আনন্দ?

আবুল হায়াত: এখন আলদা আনন্দ। আগে ছিল নিয়ে আনন্দ, এখন দিয়ে আনন্দ। এখন তো আগে থেকেই সব সেট করা থাকে কার কী কালার পছন্দ, কী ডিজাইন পছন্দ। আমরা যেমন একটা জামা পেলেই খুশি হতাম, এখন তো পাঁচ সেট, সাত সেট। আমার মেয়েরাই যেমন পাঁচ-সাত সেট করে ঈদের জামা পেয়েছে। নাতি-নাতনিদের বরং একটু অনীহা চলে এসেছে। বলে যে একটা হলেই হলো। তারপরও এসে যায়। আমি দিলাম, ওর নানি দিল, দাদা দিল, মা দিল, বাবা দিল। আবার নিজেরই হয়তো একটা পছন্দ করে কিনল চান রাতে গিয়ে। ওদের মধ্যে আগের মতো সেই উন্মাদনা দেখি না, আমাদের যেরকম উন্মাদনা ছিল; কিন্তু আমাদের মধ্যেও উন্মাদনা আছে। আমরা দেয়ার জন্য অস্থির থাকি। নাতি-নাতনি, মেয়ে, মেয়ের জামাইকে কী দেব তা নিয়ে অস্থির থাকি। আবার মেয়েরা, মেয়ের জামাইরাও আমাদের দেয়। দেয়া-নেয়ার মধ্যেই আছি।

ভিউজ বাংলাদেশ: ঈদের সংস্কৃতির কী পরিবর্তনটা দেখছেন এত বছরে?

আবুল হায়াত: সংস্কৃতি তো অনেক কিছুই বদলে গেছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি এসেছে, প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিও বদলে গেছে, ঈদের সংস্কৃতিতেও তার প্রভাব পড়েছে। আমাদের ছোটবেলায় তো টেলিভিশন ছিল না। রেডিও ছিল না। আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন আমাদের বাড়িতে রেডিও এসেছে। এর আগে চায়ের দোকানে গিয়ে রেডিওতে গান শুনতাম। হিন্দি গানগুলো শুনতাম বা আকাশবাণীর অনুরোধের আসর শুনতাম। পরবর্তীতে দেখেছি ঈদের সময় ঢাকা রেডিওতে আধুনিক গান প্রচার হতো। কলকাতায় যে গানগুলো হতো ওগুলোই ঢাকা রেডিওতে বাজতো। আর আমাদের দেশের দুচারজন, যেমন ফেরদৌসী রহমান, সোহরাব হোসেন, আনোয়ার উদ্দিন খান- এদের গান দুচারটা বাজতো।

ঈদের পর অনেক পাড়ায় ঈদ-পুনর্মিলনী হতো, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন মিলে এক সাথে হওয়া। এখন যেমন ঈদের সময় আত্মীয়বাড়ি বেড়ানোটা বোধহয় একটু কমে গেছে। ঈদের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বোধহয় এসেছে খাবারে। এখন যেমন ঈদের খাবারে অনেক কিছু যোগ হয়েছে। চটপটি, ফুচকা, দইবড়া আগে তো এসব কিছু ছিল না। আগে শুধু সেমাই, পোলাও। আমার মায়ের লাচ্ছা সেমাই খুব বিখ্যাত ছিল। আর আমার মায়ের হাতের হালুয়া। ছোলার হালুয়া, গাজরের হালুয়া, পেঁপের হালুয়া।

ভিউজ বাংলাদেশ: আমরা আজকের মতো শেষ করি, আপনার দীর্ঘজীবন থেকে সংক্ষেপে আমাদের বলুন জীবনটা শেষ পর্যন্ত কেমন?

আবুল হায়াত: জীবন আসলে কর্মক্ষেত্র। কর্মই জীবন। কাজের মধ্যেই আনন্দ। আমি তো জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছি। ক্যান্সার আক্রান্ত। ক্যামোথেরাপি নিয়েছি। যে কোনো মুহূর্তেই চলে যেতে পারি। চলে যাবার জন্য প্রস্তুত। আল্লাহর কাছে হাত তুলে দিয়েছি। আল্লাহকে বলি, আল্লাহ, একটু কষ্ট কম দিও...।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ