Views Bangladesh Logo

‘বড় সাধ, একবার আমি মিনিস্টার হব’

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

রাজনীতির অঙ্ক বড়ই জটিল। সুখীনগর রাজ্যে সেই জটিল অঙ্ক জটিলতর হলো মহারাজার “দুঃখবিষয়ক মন্ত্রী” নিয়োগের ঘোষণায়। কারণ মহারাজ ঘোষণায় বলেছেন, এমন একজনকে তিনি দুঃখবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করতে চান, যিনি সত্যিকার অর্থে দুঃখ ভোগের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং দুঃখকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন। ঘোষণার পরের দিন থেকেই নতুন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী দুঃখী মানুষের রাজদরবারের সামনে লাইন পড়ে গেল। সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে মহারাজা দেখলেন, এরা কেউই দুঃখী নয় এবং দুঃখ ভোগ বিষয়ে এদের সবিশেষ কোনো অভিজ্ঞতাও নেই। অতএব দুঃখবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টি মহারাজার নতুন দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়াল।

সুখীনগর রাজ্যে সর্বত্র সুখের নহর। সেই প্রাচীন ইতিহাসে বাড়ি বাড়ি হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া থাকার যে কিংবদন্তির গল্প আমরা শুনতাম, আজকের সুখীনগরে সুখের চিত্র ঠিক সেই রকম। বাড়িতে বাড়িতে বড় গ্যারেজে একেবারে লেটেস্ট মডেলের হাফ ডজন থেকে এক ডজন দামি গাড়ি। হাফ ডজনের নিচে এ রাজ্যে কারও গাড়ি নেই। মার্সিডিজ বেঞ্চের নিচে এখানে কেউ গাড়ি কেনে না। সুপার স্টোরগুলোতে বাসমতি চালের বাইরে আর কোনো কম দামি চাল পাওয়া যায় না। এ রাজ্যের মানুষ ভাতের হাঁড়ির সুঘ্রাণে অভ্যস্ত হয়ে গেছে আরও বহুকাল আগে থেকেই। এ রাজ্যে কেউ ভাড়া বাড়িতে থাকে না। সবার নিজের বাড়ি। সেই বাড়ির দেয়াল আবার মার্বেল পাথরের কারুকাজে শোভিত। সবাই উন্নত সুতার অতি দামি বস্ত্র পরে। তিনবার ধোয়া হয়ে গেলে সেই বস্ত্র বাতিলের খাতায় চলে যায়। এরপর পাশের দরিদ্র রাজ্যের সীমানায় সেগুলো ফেলে আসে রাজ রক্ষীরা। এ কারণে প্রতিবেশী দরিদ্র রাজ্যের মানুষরাও সুখীনগরের মহারাজার বিশেষ ভক্ত।

এখন আপনিই বলুন, এই সুখীনগর রাজ্যে দুঃখ ভোগের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যোগ্য মানুষ পাওয়া কি সহজ? কিন্তু মহারাজার মাথায় দুঃখবিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগের ভূত যেহেতু চেপেছে, তিনি এর শেষ না দেখে ছাড়বেন না। আসলে রাজকবি পথিক সাগরই এই ভূতের জন্ম দিয়েছেন। মহারাজা কবিকে বললেন, ‘ওহে কবি তোমার কবিতায় আগের মতো প্রাণ পাচ্ছি না। কেমন যেন তেতো ওষুধের মতো বিস্বাদ হয়ে যাচ্ছে তোমার কবিতাগুলো। এমন চলতে থাকলে তো মাইনে দিয়ে মন্ত্রীর মর্যাদায় রাজকবি পোষার আর কোনো দরকার হবে না। রাজকবি পথিক সাগর লাফ দিয়ে উঠলেন। সম্ভবত, রাজদরবারে মন্ত্রীর মর্যাদা হারানোর হঠাৎ শঙ্কায় তার হৃদযন্ত্রে রক্ত সঞ্চালনের গতিও হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। কারণ মহারাজার ভর্ৎসনা শেষ হতেই তিনি প্রথমে দুই হাতে বুক চেপে ধরে উঠে দাঁড়ালেন। তার ফর্সা কপালে বেশ পুরু হয়ে ঘাম জমতে দেখা গেল।

রাজকবি কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “মাহারাজ আমার চেয়ে বড় কবি এ পৃথিবীতে জন্ম নেয়নি, আর কখনো নেবেনও না। আপনি নিজেই আমার সম্পর্কে মাঝে মধ্যে এ মন্তব্য করে থাকেন। আশকারি আপনার সেই বিশ্বাস এখনো অটুট আছে।” মহারাজা কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, ‘আমিই যেহেতু তোমার নামে প্রায়শ প্রশংসা বাক্য উচ্চারণ করে থাকি, তাহলে তোমার নিজের ঢোল পেটানোর বিশেষ কোনো প্রয়োজন আছে কি? সেই মন উতলা করা শব্দগুচ্ছ তোমার কবিতায় আগের মতো খুঁজে পাচ্ছি না কেন, তার কারণ ব্যাখ্যা কর।’ রাজকবি তার কবিতার প্রাণ হারানোর কারণ খুঁজতে কিছু সময় ভাব সাগরে ডুব দেয়ার জন্য মহারাজার কাছে সময় চেয়ে নিলেন। চোখ বুঁজে কয়েক সেকেন্ড কিছু একটা ভাবলেন। তারপরই তার মুখ প্রশান্তির হাসিতে উদ্ভাসিত হলো।

উঠে দাঁড়িয়ে এক কদম এগিয়ে কুর্নিশ করে মহারাজার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হাসি, আনন্দ, সুখের কবিতার চর্চা এখন একঘেঁয়ে হয়ে গেছে। অতএব, কবিতায় নবপ্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সুখের প্রাচুর্যের পাশাপাশি গভীর দুঃখবোধের অনুভূতি প্রয়োজন; কিন্তু সুখীনগর রাজ্যে দুঃখের কোনো স্থান নাই, দুঃখবোধ হয় তার কোনো উৎসও নাই। অতএব, কবিতায় যথাযথ প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে কীভাবে? এবার মহারাজা আড়মোড়া ভেঙে নড়েচড়ে বসলেন। ঘটনা তো সত্য বলেছ রাজকবি। আমার রাজ্যে দুঃখের অভাব তো রয়ে গেছে। এ রাজ্যে কোনো কিছুর অভাব নেই’- সে গল্প তো অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এ অভাব পূরণের উপায়? এরপর অনেকে ভেবেচিন্তে একটি দুঃখবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং একজন নতুন মন্ত্রী নিয়োগ দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তার আধিকারিকদের নিয়ে রাজ্যে দুঃখবোধের অভাব দূর করার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। এই স্মার্ট দুনিয়ায় মন্ত্রী মহোদয়দের স্মার্টলি ডাকা হয় ‘মিনিস্টার’। অতএব দুঃখবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পরিচিতি হবেন ‘মিনিস্টার অব গ্রিফ’ পরিচয়ে।

দুঃখবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হওয়ার জন্য রাজদরবারে অনেকেই সাক্ষাৎকার দিলেন। প্রথমে এসেছিলেন, রাজ্যের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী। এ রাজ্যে কাঁচা বাজারের নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে বালুমহাল, জলমহাল, জুতার দোকান, কাপড়ের দোকান, টিস্যু পেপার ফ্যাক্টরি, অট্টালিকা নির্মাণ কোম্পানি সব ধরনের ব্যবসা তার আছে। মহারাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি তো এ রাজ্যে প্রায় আমার সমান ধনী। অতি সুখী মানুষ। তুমি কেমনে দুঃখবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালনা করবে?’ রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী জবাব দিলেন, ‘মহারাজ, আমার অর্থের কিংবা সম্পদের কোনো অভাব নাই, এটা সত্য। কিন্তু এত সম্পদের মালিক হয়েও ব্যবসার লাইসেন্স নবায়নের জন্য প্রতি বছরের শেষেই আধিকারিকদের দপ্তর থেকে দপ্তরে ধর্না দিতে হয়। আর মন্ত্রী মহোদয়রা তখন আকাশের দিকে চোখ তুলে বসে থাকেন। সেই চোখের সদয় দৃষ্টি আদায় করা কত যে পেরেশানির বিষয়, আপনাকে চট করে বোঝাতে পারব না। এ দুঃখ আমাকে প্রায়ই তাড়িত করে। সে কারণে আমি দুঃখী এবং দুঃখবোধে আক্রান্ত থাকার অভিজ্ঞতাও আছে। অতএব, নতুন মন্ত্রণালয়ের জন্য আমি নিজেকে যোগ্যতর দাবি করতেই পারি।’ মহারাজ ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘আধিকারিকদের দপ্তরে দপ্তরে ধর্না দেয়া, বিশেষ কোনো দুঃখবোধ হিসেবে আমার কাছে বিবেচিত হচ্ছে না । তুমি এখন যাও।’

দ্বিতীয় সাক্ষাৎকার প্রার্থী হিসেবে এলেন দেশর সেরা অভিনয় শিল্পী। পাঁচবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি অভিনয় করলেই সেই সিনেমা বক্স অফিস হিট। তিনি মহারাজাকে জানালেন, ‘হে রাজন, আমি একজন অনেক বড় শিল্পী। এ রাজ্য শুধু নয়, আশপাশের দশ রাজ্যের মধ্যে আমিই শ্রেষ্ঠ অভিনয় শিল্পী। অতএব দেশের সুন্দরীতমা নায়িকারা আমার প্রতি আকৃষ্ট হবেই। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।’ শুটিংয়ের পর নায়িকার সঙ্গে এক কাফ কফি কিংবা একান্তে ব্যক্তিগত বাগানে বনভোজন দোষের বলে গণ্য হওয়া উচিত নয়। অথচ দেখুন, আমার প্রথম স্ত্রী যিনি নিজেও নায়িকা ছিলেন, তিনি অন্য নায়িকাদের সঙ্গে আমার অন্তরিকতা নিয়ে ভর্ৎসনা করতে লাগলেন। বাসায় ঢুকলেই মুখ ঝামটা দিয়ে ব্লেজারের কলার চেপে ধরতেন। অগত্যা তাকে ডিভোর্স দিলাম। এরপর আর একজন নায়িকাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলাম। তিনিও বছর না ঘুরতেই প্রথম স্ত্রীর পথ অনুসরণ করে আমার প্রতি ভর্ৎসনা বাক্য প্রয়োগ করতে শুরু করলেন। এরপর আবার ডিভোর্স। এরপর তৃতীয়, চতুর্থ স্ত্রী, পঞ্চম স্ত্রী, তাদেরও শেষ পর্যন্ত ডিভোর্স দিতে হলো। এরপর বিয়ের বদলে হাল আমলের ‘গার্লফ্রেন্ড’ কৌশলে গেলাম। সেখানেও বিপত্তি। এক গার্লফ্রেন্ড আর এক গার্লফ্রেন্ডকে সহ্য করতে পারে না, আবার সেই ভর্ৎসনা।


আজও আমার একাদশ নম্বর গার্লফ্রেন্ডের কাছে এক গাদা কটু বাক্য হজম করেই তবে আপনার দরবারে এলাম। এবার আপনিই বিচার করুন মহারাজ, আমার দুঃখবোধ কতটা গভীর। অতএব নতুন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের জন্য যোগ্য বিবেচিত হতেই পারি। মহারাজ কিছুটা বিরক্তির সুরে বললেন, ‘তুমি তো বেশ ফুর্তিতেই আছ দেখছি। ফুর্তিবিষয়ক টানাপড়েনে তোমার যে দুঃখবোধ তা মন্ত্রী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।’

তৃতীয় জন এলেন, রাজ্যের সেরা ক্রীড়াবিদ। খেলাধুলার জগতে তিনিই রাজ্যবাসীর কাছে মহারাজা। তারপরও তিনি এসেছেন মন্ত্রী হওয়ার বিশেষ আগ্রহ নিয়ে। তিনি জানালেন, ‘তিনি দেশে-বিদেশে ক্রীড়াবিদ হিসেবে যথেষ্ট সম্মান পেয়েছেন। এ সম্মান অনেক রাজ্যের মহারাজারাও পায় না; কিন্তু তাকেও একটি ক্রীড়া বোর্ডের অধীনে খেলোয়াড় হিসেবে মনোনীত হতে হয়। যে বোর্ডের প্রধানের পদ একজন মন্ত্রী মহোদয় অলঙ্কৃত করেন। মন্ত্রী মহোদয় কোনোদিন খেলার মাঠে এক পা না দিয়েও দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে তার মতো বিশ্বজোড়া খ্যতিমান ক্রীড়াবিদের ওপর ছড়ি ঘোরাতেই থাকেন, চোখ রাঙিয়ে কথা বলেন, তখন দুঃখে প্রাণ ফেটে যায়। এই গভীর দুঃখবোধ থেকেই তিনি মন্ত্রী হতে চান। ‘মহারাজা মুচকি হেসে বললেন, ‘তোমার দুঃখবোধের বর্ণনা আমার ভেতরে হঠাৎ তীব্র রাগের সঞ্চার করছে। তুমি দ্রুত রাজদরবার ত্যাগ কর।’

চতুর্থ জন রাজসভার সাবেক মুখ্য আধিকারিক। তিনি রাজদরবারে প্রবেশ করতেই মহারাজা কিছুটা হায় হায় করে উঠলেন। ‘আরে তুমিও। আমি তো তোমার পরামর্শে রাজ্যের বিভিন্ন স্তরের আধিকারিকদের মাইনে তিনগুণ বাড়িয়েছি। দামি গাড়ি, রাজপ্রাসাদের আদলে বিশেষ আবাসিক এলাকা স্থাপন, অবসরে গেলে লাভজনক ব্যবসার লাইসেন্স সবকিছু দিয়েছি। তুমি মন্ত্রী মহোদয়দের চেয়েও ক্ষেত্র বিশেষে অধিক ক্ষমতা ভোগ করেছ। তারপরও তোমার কিসের দুঃখ? সাবেক মুখ্য আধিকারিক কথা বলার শুরুতেই চোখ মুছলেন। ফোঁস ফোঁস করে বার দুয়েক নাক টানলেন। তারপর মাথাটা কিছুটা ঝুঁকে কুর্নিশের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মহারাজ আমি এই রাজসভার মুখ্য আধিকারিক ছিলাম। সে সময় মন্ত্রী মহোদয়দের অসংখ্য চাহিদা আমি পূরণ করেছি। অনেক মন্ত্রী মহোদয় আপনার রোষানলে পড়লে কৌশলে তাদের রক্ষা করেছি। অথচ দেখুন, আমি অবসরে যাওয়ার পর সেই মন্ত্রী মহোদয়রা আমার টেলিফোন পর্যন্ত ধরে না। আমার মেয়ের বুটিকের ব্যবসার জন্য নতুন একটা লাইসেন্স চাইলাম, বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয় অনুমোদন করলেন না। উল্টো বলে দিলেন, আমি নাকি চাকরিতে থাকার সময় যথেষ্ট সুবিধা নিয়েছি। এখন লাগাম টানা উচিত। এর অর্থ কি বলুন, আমরা আধিকারিকরা অবসরে গেলেই সব সুবিধা শেষ, আর মন্ত্রী মহোদয়রা আজীবন সুবিধা ভোগ করতে থাকবেন? মহারাজ, এই দুঃখবোধে আমার এখন রাতে ঘুম হয় না। ভোরবেলা ঘুমিয়ে পড়ি, অনেক বেলা করে ঘুম ভাঙে।


এর ফলে স্বাস্থ্যেরও বেশ অবনতি হতে শুরু করেছে। আপনিই বলুন, আমার দুঃখবোধ যথার্থ কি না। সাবেক মুখ্য আধিকারিক থামতেই মহারাজা কিছুটা ভর্ৎসনার সুরে বললেন, ‘কি সর্বনাশ। অনিদ্রায় ভুগলে কিংবা স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে তুমি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবে কেমনে? তোমার উচিত এই মুহূর্তেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।’

এরপর একে একে সাক্ষাৎকার দিলেন রাজ্যের সবচেয়ে নামি সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী। তাদের সবার দুঃখবোধের ধরন প্রায় একই রকম। পেশাগত জীবনে তারা শুধু খেটেই মরেন। তারাই নিজেদের অসামান্য মেধা, প্রজ্ঞায় জাতির সেবা করে যাচ্ছেন তথ্য দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে, আইনি সেবা দিয়ে, চিকিৎসা দিয়ে, প্রযুক্তির ব্যবহার দিয়ে। অথচ সরকারি অন্য আধিকারিকদের মতো সুযোগ-সুবিধা, সম্মান কিছুই পান না। ছোট ছোট অনেক কাজে প্রশাসনিক আধিকারিকের অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য কষ্টার্জিত আয় থেকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে বাধ্য হতে হয়। এমনকি পেশাগত কাজ থেকে এক দিনের জন্য ছুটি নিতে হলেও সরকারি কিংবা বেসরকারি দুই ধরনের কর্মস্থলেই নিম্নপদস্থ প্রশাসনিক আধিকারিকের চোখ রাঙানি সহ্য করতে হয়। এই সুখের নহর বয়ে চলা রাজ্যে সত্যিকারের দুঃখী যদি কেউ থাকে তাহলে এই পেশাজীবীরাই আছেন।

মহারাজা বেশ ফাঁপরে পড়লেন। সাংবাদিক, শিক্ষক, উকিল, চিকিৎসক, প্রকৌশলীদের দুঃখবোধ অনেকটাই যথার্থ বটে; কিন্তু সবাইকে তো আর একসঙ্গে একটা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া যায় না! অতএব এদের সবাইকেই বিদায় করে দিলেন। রাজদরবার মুলতবি করতে যাবেন, এমন সময় রাজ অভ্যর্থক জানালেন, আরও একজন সাক্ষাৎ প্রার্থী আছেন। তিনি রাজ্যের এক ভবঘুরে বাউল। মহারাজের চোখ হঠাৎ কপালে উঠলেও বাউলকে সামনে নিয়ে আসতে বললেন। বাউলের পোশাক দেখে মহারাজ দারুণ ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে পড়লেন।

ক্রোধান্বিত কণ্ঠে মহারাজ বললেন, ‘এটা আমার কাছে খুবই আশ্চর্য লাগছে যে, এ রাজ্যে এখনো এই ছেঁড়া পোশাকের ভবঘুরে আছে। এর চোহারা পুরোটাই দুঃখী, গরিব মানুষের চেহারা। আমার রাজ্যে এটা অকল্পনীয়। এ রাজ্যের মন্ত্রী মহোদয়, পদস্থ আধিকারিকরা তাহলে কি আমাকে রাজ্যের অবস্থা সম্পর্কে ক্রমাগত ভুল তথ্য দিয়েছেন...? মহারাজের কথায় রাজদরবারে সবাই চুপ। কয়েক সেকেন্ড পর বাউলই নীরবতা ভাঙলেন। তার চোখ-মুখ অন্য এক আলোয় উদ্ভাসিত।

‘মহারাজ, উত্তেজনা পরিহার করুন। উত্তেজনা শরীরের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক নয়। আপনি অনুমতি করলে একটা গান ধরতে পারি। সংগীত আমার মনকে শান্ত করবে নিশ্চয়।’ মহারাজ ইশারায় তাকে অনুমতি দিলেন। বাউল গান শুরু করল, “গুরু আন্ধারে বাস করে, গুরু আন্ধারে বাস করে...হাতের কাছে যারে পাইল, তার কথাতেই মইজ্যা রইল, দিন দুনিয়ায় কি ঘটিল, খবর রাখল না’রে ...গুরু আন্ধারে বাস করে “...। বাউলের গলা আরও চড়তেই মহারাজা তাকে থামিয়ে দেন। ‘বাউল, তোমার সংগীত আমার মাথায় যন্ত্রণার সৃষ্টি করছে। এবার বল, তুমি কেন নিজেকে মন্ত্রী হওয়ার যোগ্য মনে কর।’


বাউল এবার কি এক ধরনের সুরেলা কণ্ঠে জবাব দেয়, ‘হে রাজন, আমি মনের আনন্দে গান গাই। পথে পথে ঘুরে বেড়াই। খিদে পেলে চোখের সামনে যে বাড়ি কিংবা খাবারের দোকান পাই সেখানেই খাবার ভিক্ষা চাই। কেউ কোনোদিন না করে না। সুখীনগর রাজ্যে অভুক্ত কেউ খাবার চাইলে কেউ না করে না। এ জন্যই এ রাজ্য যথার্থ সুখীনগর বলে মনে হয় ‘ছোট্ট একটা দম নিয়ে বাউল আবার কণ্ঠ খোলেন। ‘হে রাজন, আমার কোনো কিছু নিয়েই দুঃখ নেই, কোনো চাওয়া নেই; কিন্তু আমার একটা সাধ আছে। আমি জানি আমার এ সাধ এ জন্মে কিংবা পরের জন্মেও পূরণ হওয়ার নয়। কেন এ সাধ জাগে, তাও জানি না। তবু আমার বড় সাধ, একবার আমি মিনিস্টার হব।’

মহারাজ এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। ‘আরে বাউল, জন্ম জন্মান্তরে তোমার মন্ত্রী হওয়ার সাধ অপূর্ণ থাকার যে দুঃখবোধ, তা যথার্থ। আমি যোগ্য প্রার্থী পেয়ে গেছি। তুমিই হবে আমার দুঃখবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। কিন্তু একটা শর্ত আছে।’ রাজদরবারে উপস্থিত সবাই মুখ চাওয়াচায়ি করলেন। বাউল নিশ্চুপ। মহারাজ নিজেই শর্তের কথা বললেন। ‘বাউল, শর্ত একটাই। যতদিন মন্ত্রী থাকবে, তুমি তোমার মনের মতো কোনো গান গাইতে পারবে না। আমি যেমন গান শুনতে চাইব, তেমনই শোনাবে। আমি হাসতে বললে হাসবে, কাঁদতে বললে কাঁদবে। তুমি রাজি?’


এবার বাউল কুর্নিশ করে বললেন, ‘হে রাজন, আপনি যথার্থ জ্ঞানী এবং এ কারণেই আপনি জানেন, আমার মতো পথচারী স্বাধীন বাউল কখনই পরাধীনতার শৃঙ্খলের শর্ত মেনে মন্ত্রী-মিনিস্টার হতে রাজি হবে না। আপনার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমি রাজদরবার থেকে বিদায় নিচ্ছি।

রাশেদ মেহেদী: কথাসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ