স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ বন্ধ: রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রশ্ন
স্বাধীনতা দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং এরপর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। এই দিনটি শুধু একটি জাতীয় দিবসই নয়, বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার চেতনার প্রতীক; কিন্তু সম্প্রতি স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান, বিশেষ করে কুচকাওয়াজ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রীতি। এটি শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত করার এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথাকে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ায় এই দিবসের আনুষ্ঠানিকতাগুলো নানা সংকটের মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র সচিব ঘোষণা করেছেন যে, গত বছরের মতো এই বছরও বিজয় দিবসের মতো স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হবে না। তিনি জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টার মতে, দেশ এখন এক ধরনের ‘যুদ্ধাবস্থার’ মধ্যে রয়েছে এবং এমন অবস্থায় স্বাধীনতা দিবসের মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যুক্তিযুক্ত নয়। পাশাপাশি, রমজান মাস এবং সরকারি ছুটির বিষয়টিও এই সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কিন্তু এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য আসে। সেখানে বলা হয়, স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ বাতিলের খবর সঠিক নয়। ঢাকার স্টেডিয়ামে সংস্কার কাজ চলায় সেখানে কুচকাওয়াজ না হলেও দেশের অন্যান্য জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে যথারীতি কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হবে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা প্রদান করা হবে। এই ঘোষণার ফলে স্বরাষ্ট্র সচিব এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের মধ্যে এক ধরনের মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটা একদিকে যেমন জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের কোন বক্তব্য সঠিক?
স্বরাষ্ট্র সচিব যদি সত্য বলে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন আসে বর্তমানে দেশে এমন কী সংকট চলছে যে স্বাধীনতা দিবসের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করা সম্ভব নয়? যেখানে অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে, সেখানে শুধুমাত্র স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বক্তব্যকে সত্য ধরে নিলে প্রশ্ন ওঠে ঢাকা স্টেডিয়ামে সংস্কার কাজ চলছে বলে কি পুরো ঢাকা শহরের অন্য কোথাও কুচকাওয়াজ আয়োজন করা সম্ভব নয়? রাজধানীতে কি এমন কোনো স্থান নেই যেখানে এই আয়োজন করা যেতে পারে? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে স্বাধীনতা দিবসের মূল আয়োজন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে?
স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তকে অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রভাব সবসময়ই লক্ষণীয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাজকর্ম নিয়ে অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে পরোক্ষভাবে মদদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই সরকারের আমলে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির দাপট বাড়তে দেখা গেছে যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।
স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তকে অনেকেই এই প্রেক্ষাপটে দেখছেন। তারা মনে করছেন, সরকার স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির চাপে বা তাদের সঙ্গে আপস করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার যেন স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য ও চেতনাকে ক্ষুণ্ন করতে চাইছে। এটা কি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রতি সরকারের নমনীয়তার প্রকাশ?
সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, তারা স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের প্রতি বিশেষ আগ্রহী নয়। বিজয় দিবসেও অনুরূপ উদাসীনতা লক্ষ করা গেছে। স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়তো সরকারের জন্য একটি প্রশাসনিক বা কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে, তবে এটি পরোক্ষভাবে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থানকে উৎসাহিত করতে পারে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা করতে চেয়েছে, আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যদি স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে পালন না করা হয়, তবে সেটি তাদের জন্য একটি বিজয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে যুদ্ধাবস্থা চলছে এবং এই পরিস্থিতিতে আনন্দ করার মেজাজে নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশে কি সত্যিই এমন কোনো যুদ্ধাবস্থা চলছে যা স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান বন্ধের মতো জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে? দেশের অন্যান্য সব কিছুই তো স্বাভাবিক গতিতে চলছে। স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য সবই তো চলমান। তাহলে শুধু স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা কী?
এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার মাধ্যমে সরকার যেন স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার যেন স্বাধীনতা দিবসের চেতনা ও মূল্যবোধকে অস্বীকার করছে।
স্বাধীনতা দিবস শুধু একটি জাতীয় দিবস নয়, এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার চেতনার প্রতীক। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কী পরিমাণ ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত এই চেতনা ও মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ন করার একটি অপচেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার যেন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করছে।
স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার যেন স্বাধীনতা দিবসের চেতনা ও মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ন করতে চাইছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার যেন স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করছে। স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য ও চেতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে। এই চেতনা ও মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ন হতে দেয়া যাবে না।
আর যদি সত্যিই জরুরি পরিস্থিতির কারণে এই আয়োজন বন্ধ রাখা হয়, তবে সরকারের উচিত জনগণকে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা প্রদান করা। অন্যথায়, এটি নিছক এক রাজনৈতিক গড়িমসি ও অস্পষ্ট নীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই গণ্য হবে। স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে রাষ্ট্রের ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত অবস্থান থাকা জরুরি, যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শিত হয় এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র সফল হতে না পারে।
চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে