ভারত জিতেছে, পাকিস্তানও স্বস্তি পেয়েছে
দুবাইয়ে ভারত হোম গ্রাউন্ড বানিয়ে যেভাবেই হোক অপরাজিত থেকে তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয় করে গায়ে সাদা ‘ব্লেজার’ পরার স্বপ্ন বাস্তবে বাস্তবায়িত করেছে। অধিনায়ক রোহিত শর্মার নেতৃত্বে ভারত টানা দুটি আইসিসি টুর্নামেন্টে শিরোপা জিতল। এই জয় নিশ্চয়ই শেষবারের মতো (২০১৭) ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে পরাজয় এবং ২০২৩ সালে নিজ দেশে ওয়ানডে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার কাছে পরাজয়ের ভারকে হালকা করেছে। এবার নিয়ে ভারতের এটি সপ্তম আইসিসি ট্রফি জয়। এর মধ্যে আছে ওয়ানডে বিশ্বকাপ দুটি, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি তিনটি এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দুটি। ভারতের ক্রিকেট সামনে তাকাচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা শুধু দেশে নয় বিদেশেও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জিতছে।
নবম চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ভারত নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করেছে ৪ উইকেটে। এতে ট্রফি থেকে গেল আবারও এশিয়ার ঘরে। ভারত শক্তিশালী এবং ভারসাম্য দল। কিছু তারকা খেলোয়াড় মধ্যাহ্নের সূর্যের মতো জ্বলছেন। ভারত ট্রফির লড়াই শুরু করেছে ‘হট ফেভারিট’ হিসেবে বিভিন্ন ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। একই স্থানে অবস্থান করে, একই স্টেডিয়ামে তৈরি উইকেটে সবগুলো খেলার সুযোগ নিশ্চিত করা তো বিরাট বিষয়। অন্য দলগুলো তো স্বাগতিক পাকিস্তান উইকেটের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর উড়ে এসে দুবাইয়ের কন্ডিশনে খেলেছে। নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার বলেছেন, ‘আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে; কিন্তু আমরা একটি দল হিসেবে এগিয়ে গিয়েছি।’
ভারত সেমিফাইনালে পরাজিত করেছে অস্ট্রেলিয়াকে যারা এককভাবে সবচেয়ে বেশি (দশটি) আইসিসি ট্রফি জয় করেছে। দুবাইয়ের উইকেটে ভারত চারজন স্পিনার নিয়ে খেলেছে এবং ফলও পেয়েছে। পরিসংখ্যানে লক্ষণীয় হয়েছে প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভারতীয় স্পিনাররা বেশি কার্যকরী হয়েছেন। প্রতিপক্ষ দলগুলো কিন্তু ভারতের বিপক্ষে এত স্পিনার নিয়ে ক্রিকেট যুদ্ধে নামেনি। উইকেট থেকে সুবিধা ভারত কাজে লাগিয়েছে।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্বাগতিক দেশ পাকিস্তান। ভারত জিদ ধরেছে তারা কোনো মতেই পাকিস্তানে খেলতে যাবে না। তারা খেলবে অন্য নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আর সেটি দুবাই। স্বাগতিক পাকিস্তানের বক্তব্য হলো আইসিসি তো নিরাপত্তা এবং অন্য সব রকম বিষয়ে সবুজ সংকেত নিশ্চিত করার পরই পাকিস্তান স্বাগতিক দেশ হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। ভারতকে পাকিস্তানে খেলতে হবে কোনো রকম অন্যায় আবদার চলবে না। পাকিস্তান তো আইসিসির ইভেন্টে অংশ নিতে ভারতে যায় তা হলে ভারত কেন পাকিস্তানে আসবে না। ভারত তার তথাকথিত ক্রিকেট কূটনীতি থেকে সরে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে অটল। মুশকিলে পড়েছে আইসিসি। ক্রিকেট তো বড় ব্যবসা। ভারত যদি না খেলতে আসে আর পাকিস্তানে যদি নাছোড়বান্দার ভূমিকা থেকে সরে না আসে তাহলে অনেক মুনাফার ইভেন্ট শেষ পর্যন্ত লোকসানের খাতায় নাম লেখাবে। শুধু তাই নয় অংশগ্রহণকারী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আইসিসির সমস্যা হলো ক্রিকেট বাণিজ্যের ‘বস’ ভারতকে কখনো নাখোশ বা চটাতে চায় না। কেন চাইবে গরু এবং দুধ উভয় হারাতে।
এদিকে পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আয়োজন মানেই আইসিসি ইভেন্ট আবার ২৯ বছর পর ফিরে আসা। পাকিস্তান এবং তার ক্রিকেট বোর্ড যেটির প্রতীক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে। পাকিস্তানের হিসাবও এখানে সহজ ছিল না। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের মতবিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে যদি ট্রফির খেলা এশিয়ার বাইরে অন্য কোনো দেশে স্থানান্তর করা হয় তাহলে তো পাকিস্তানের প্রত্যাশার ‘অপমৃত্যু’ ঘটবে। শুধু তাই নয় ক্রিকেট বাণিজ্য ছাড়াও দল হিসেবে ভারত যে স্বপ্ন দেখছে তা বাইরের কন্ডিশনে বাস্তবায়িত নাও হতে পারে। আর পাকিস্তান যদি ভালোয় ভালোয় ট্রফি খেলা সম্পন্ন করতে পারে তাহলে তো সোনায় সোহাগা। এটি অনেক বড় বিজয় এবং স্বস্তি। আর তাই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান অনঢ় অবস্থা থেকে সরে এসে ভারতকে তার ইচ্ছানুযায়ী দুবাইয়ে খেলার ক্ষেত্রে রাজি হয়েছে। স্বাগতিক দেশ কিন্তু পাকিস্তানই থেকে গেছে। এতে করে ভারতের গ্রুপের দেশগুলো বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। কেননা শুধু ভারতের বিপক্ষে খেলার জন্য তাদের কয়েক হাজার মাইল দূরে দুবাই গিয়ে খেলতে হবে এবং আবার পাকিস্তানে ফিরে আসতে হবে।
আইসিসি ওয়ানডে সংস্করণের বিশ্বকাপের আলাদা গুরুত্ব এবং মর্যাদা আছে। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে ভারত ও শ্রীলংকার সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপের আয়োজন করেছিল পাকিস্তান। এরপর গত ২৯ বছর আর পাকিস্তানে আইসিসির কোনো ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়নি। কারণ হলো নিরাপত্তার অভাব। ২০০৮ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানে; কিন্তু নিরাপত্তা শঙ্কায় বিভিন্ন দল উদ্বেগ জানাতে শুরু করলে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির খেলা পাকিস্তান থেকে সরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যায়। খেলা হয়েছে ২০০৯ সালে।
পাকিস্তানে ক্রিকেট মহাবিপদে পড়ে ২০০৯ সালে। লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের বাইরে শ্রীলংকা দলের টিম বাসে সন্ত্রাসী হামলা চালায়। এতে ছয়জন পুলিশ, দুইজন পথচারী এবং বাসে অবস্থানকারী কয়েকজন ক্রিকেটার আহত হন। সেদিনই শ্রীলংকান দল বিশেষ ব্যবস্থায় দেশে ফিরে যায়। এই ঘটনা ক্রিকেট বিশ্বকে নাড়া দেয়। সন্ত্রাসী হামলার পর পরবর্তী ছয় বছর আইসিসির কোনো সদস্য দেশ আর পাকিস্তানে যায়নি খেলতে। এরপর ২০১৫ সালে জিম্বাবুয়ে দলের পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরে আসে। ২০১৭ সালে পাকিস্তান দেশে পিএসএল আয়োজন করে। এতে বিদেশি ক্রিকেটাররা অংশ নিয়েছেন। এরপর থেকে ভারত ছাড়া প্রতিটি টেস্ট খেলুড়ে দল এবং আইসিসি সহযোগী সদস্য দেশ পাকিস্তানে যেয়ে দ্বিপক্ষীয় এবং ত্রিদেশীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছে, কোনো সমস্যা হয়নি। ভারত ক্রিকেট দল পাকিস্তানে যেতে না চাইলেও অন্যান্য খেলার দলগুলো কিন্তু পাকিস্তানে যাচ্ছে এবং খেলায় অংশ নিচ্ছে। সম্প্রতি সাউথ এশিয়ান গেমস ফেডারেশন পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী সাফ গেমস পাকিস্তানে সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও গেমস আয়োজনের ক্ষেত্রে তার সরকারের সম্মতির কথা জানিয়েছে।
ভারত ক্রিকেট দল পাকিস্তানে খেলতে যেতে না চাওয়ার পেছনে নিরাপত্তার চেয়ে ভূরাজনীতির প্রভাবই বেশি বলে মনে হয়। এই দুই দেশের ক্রিকেট মানেই উভয় দেশের রাজনীতিবিদদের জন্য নিত্য কার্যকলাপের বাইরে সক্রিয় হয়ে ওঠা। প্রতিবেশী দুটো দেশের মধ্যে ক্রিকেটকে ঘিরে অদ্ভুত এক ধরনের ‘ইগো’ সমস্যা আছে।
নবম চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড অত্যন্ত সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে। আইসিসির প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানে আয়োজন, নিরাপত্তা এবং আতিথিয়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পাকিস্তানও বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে তারা খেলাটাকে কত বেশি ভালোবাসে। দর্শকরা দেখিয়েছে যে, তাদের ক্রিকেটপ্রীতি এতটুকুও কমেনি।
নিজ দেশে এতদিন পর আইসিসির ক্রিকেট ফিরে এসেছে। তবে মাঠে পাকিস্তান ছিল ভীষণ বিবর্ণ। বিষয়টিকে প্রাক্তন ক্রিকেট ‘গ্রেট’ এবং ক্রিকেট অনুরাগীরা মেনে নিতে পারেননি। তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে দলটি। বৃষ্টির বদৌলতে ১ পয়েন্ট জুটেছে। পাকিস্তানের ক্রিকেট তারকাদের বক্তব্য হলো ‘জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু পথযাত্রী ক্রিকেটকে সবাই মিলে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে।’
ইকরামউজ্জমান: কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার ফুটবল এশিয়া।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে