নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের মাধ্যমে আমাদের আত্মপরিচয় বিকশিত হোক
বংশ পরম্পরায় মানুষের যে আচার-সংস্কৃতি-বিশ্বাস-রীতিনীতি-শিল্প-সাহিত্য-খাদ্যাভ্যাস-পোশাক-ভাষা- মোট কথা একটি দেশ-জাতির শত-সহস্র বছর ধরে চলমান সব কিছুই তার ঐতিহ্যের অংশ। এসব কিছুর মধ্যেও বিশেষ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য একটা দেশ-জাতির মানুষের আলাদা পরিচয় বহন করে- সেগুলো বিশেষ ঐতিহ্যের অংশ। কোনো জাতিই চায় না এই ঐতিহ্যগুলো নষ্ট করতে। তাহলে তার জাতির আত্মপরিচয় মুছে যায়। আমাদেরও এরকম কিছু ঐতিহ্য আছে- আমাদের বাউল গান, পয়লা বৈশাখ, শীতের পিঠা, শীতল পাটি, রিকশা ইত্যাদি। এর মধ্যে আমাদের কিছু ঐতিহ্য জাতিসংঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে- সোমপুর বিহার, সুন্দরবন, সিলেটের শীতল পাটি, বাউল গান, বাগের হাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, জামদানি, ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র, ইফতার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ।
এই ঐতিহ্যগুলো টিকিয়ে রাখা, সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ওপর আঘাত আসে নানা দিক থেকেই। ধর্ম-রাজনীতির কারণে অনেক দেশের সংস্কৃতি বিনষ্ট হয়। এক সময় যেমন ঔপনিবেশিকতার কবলে পড়ে অনেক দেশ-জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এখনো তেমন বিশ্বায়নের ফাঁদে পড়ে অনেক দেশের ঐতিহ্য হুমকির মধ্যে পড়েছে। এর সঙ্গে তো আকাশ সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির দৌরাত্ম্য আছেই।
চাইলেও অনেক ঐতিহ্য-সংস্কৃতি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব না, সময়ের সঙ্গে অনেক সংস্কৃতি-ঐতিহ্য বদলে যায় সত্য; কিন্তু যা একেবারেই একটা জাতির আত্মপরিচয়ের আত্মা বহন করে, তাকে যেভাবেই হোক টিকিয়ে রাখা আমাদের কর্তব্য। বাঙালি হিসেবে যেমন আমাদের কিছু নিজস্ব ঐতিহ্য আছে, তেমনি বিভিন্ন ধর্ম-সংস্কৃতি পরিচয়েরও ঐতিহ্য আছে; আছে এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন রকম নিজ নিজ ঐতিহ্য। এসব কিছু মিলিয়েই আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র বা জাতি গড়ে উঠেছে। কারও সংস্কৃতি-ঐতিহ্যকে আমরা কারোটার চেয়ে ছোট-বড় করতে পারি না।
নানা রঙের এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যতার মধ্যে যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয় সেটাই একটা দেশ-জাতি বা সমগ্র মানবজাতিরই সৌন্দর্য। সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের একটা স্বতঃস্ফূর্ত ধারা আছে, তাকে জোর করে যেমন টিকিয়ে রাখা যায় না, আবার একেবারে ধ্বংসও করা যায় না। মানুষের রক্তপ্রবাহ, শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্য দিয়েই এই ধারা প্রবাহিত হয়। তারপরও আধুনিক এই আকাশ আগ্রাসনের সময়ে, নয়া সাম্রাজ্যবাদের আক্রমণের যুগে, জাতীয়তাবাদের উগ্র উল্লুম্ফনের কালে অবশ্যই আমাদের যার যার সংস্কৃতি-ঐতিহ্য নিয়ে বেশি করে সচেতন হতে হবে- যেন কেউ কেবল মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে আমাদের আত্মপরিচয় মুছে দিতে না পারে।
আমাদের ধর্ম-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ওপর দীর্ঘকাল ধরেই নানাভাবে আঘাত আসছে। প্রথম আঘাত এসেছিল আমার ভাষার ওপর দিয়ে, সেই আঘাত আমরা প্রতিহত করেছি; পরবর্তীতে আমাদের ধর্ম-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের বহু জায়গাতেই নানাভাবে আঘাত এসেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেই আমরা জাতি হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয় বহন করে চলেছি, বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি।
এখনো আমাদের আত্মপরিচয় মুছে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, নানাভাবে আমাদের নানা সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ওপর আঘাত আসছে; আমরা অবশ্যই এসব চক্রান্তের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াব। আমরা চাই নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্যর মধ্য দিয়ে আমাদের আত্মপরিচয়ের বিকাশ হোক; আর এ জন্য সরকার বলি আর জনগণ বলি, আমাদের সবারই সমান কর্তব্য।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে