Views Bangladesh Logo

ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে আমাদের ঐক্য ও সংহতির পথ দৃঢ় হোক

জাতীয়তাবাদ-ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, যা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এশিয়া, অফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে- তা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতেই ইউরোপের দুটি দেশে- ইতালি ও জার্মানিতে আত্মপ্রকাশ করেছিল ফ্যাসিবাদ হিসেবে। সেই জাতীয়তাবাদ আবার ফিরে আসছে নয়া আদলে। বাংলাদেশের চারদিকে বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে। মিয়ানমারের উগ্র জাতীয়তাবাদের নেতিবাচক ফল বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন। ভারতেও একই বিষয় ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত মিলছে। চারদিকেই এক ধরনের বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটছে।

গতকাল শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের (বিআইপিএস) আয়োজনে ‘ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও কৌশলগত অপরিহার্যতা’বিষয়ক এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের আশপাশে একটা নতুন স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। স্নায়ুযুদ্ধ আগে ইউরোপে থাকলেও এবার তা বাংলাদেশের ঘাড়ে এসেছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে টানাটানি, আবার ভারতের সঙ্গে চীনের। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী দেশ। ফলে এখানে চিন্তার কারণ আছে এবং সাবধান হওয়া দরকার।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ের রাজনীতিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া উচিত হবে না। নতুন এই বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য জাতীয় সংহতি তৈরি করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় সংহতি আমরা তৈরি করব কী করে? আমরা তো বরং দেখছি আমাদের বহু বিভাজন রেখা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের আগেও যেমন আমাদের রাজনীতি-সংস্কৃতি বহুধা বিভক্ত ছিল, এখনো তাই। কিছু ক্ষেত্রে বরং বাড়ছে এবং ধর্মীয় ও নানা মতাদর্শিক বিরোধের কারণে আমরা নিজের পায়ে কুড়াল মারছি ক্রমাগত।

দেশের সাম্প্রতিক কিছু বিশৃঙ্খল ঘটনা- যা ফলাও করে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে- এতে করে আমাদের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুণ্ন হয়েছে, সংহতিতেও ফাটল ধরিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম ঐক্যের সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। তা এখনো দেখা যাচ্ছে না। আমরা বরাবরই সাবধান করেছি, বাংলাদেশ এক ভয়াবহ ভূরাজনীতির খপ্পরে পড়তে যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ সংকটের চেয়ে আমাদের আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে- কিন্তু এক ধরনের উচ্ছৃঙ্খল মানুষ কখনো আমাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। এ অঞ্চলের ভূ-অর্থনীতি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে আজ রাজনীতি-বিশ্লেষকরা যখন বলেন, এখানে প্রথম শক্তি চীন, যাদের অর্থনীতি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম।

মিয়ানমারসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশ নিয়ে গঠিত আসিয়ান দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে উঠে আসছে। তৃতীয় শক্তি হিসেবে আসছে ভারত। ২৫ বছর পর এ অঞ্চলে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে পারে, যা মার্কিন অর্থনীতির চারগুণ বড়। এর সঙ্গে হয় বাংলাদেশকে চলতে হবে, নয়তো এই অর্থনীতিগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। যারা বাংলাদেশকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে; তখন চিন্তার কারণ আছে বৈকি। চারদিকে জাতীয়তাবাদের উত্থানে বাংলাদেশ কতটা সাবধান থাকতে পারবে- সেটাই এখন প্রশ্ন?

নতুন এই বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য জাতীয় সংহতি তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থাকতে হবে। অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি লাগবে। বাংলাদেশের বাইরে যে ভূকৌশলগত পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, সেসব বুঝতে হলে সজাগভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রোহিঙ্গার মতো ঝড় আসার আগেই প্রতিরোধমূলক কূটনীতির মাধ্যমে সামাল দিতে হবে।

বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকেই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। তরুণ প্রজন্মের ওপর ভরসা রাখতে হবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে নতুন পথ আবিষ্কার করতে হবে। নিজের দল-মত-পথ নয়; সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে নিজের দেশ। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের এখনই সাবধান হওয়া ছাড়া উপায় নেই। দরকার আত্মসচেতনতা। নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি অবসান ঘটিয়ে আমাদের ঐক্য ও সংহতির পথ দৃঢ় হোক।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ