Views Bangladesh Logo

টেলিযোগাযোগ খাতের সংস্কার

টেকনিক্যাল অনুসন্ধান করুন, সঠিক সিদ্ধান্ত নিন

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

টেলিযোগাযোগ খাতে সংস্কার নিয়ে সরকার এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিটিআরসি দৃশ্যত, কিংকর্তব্যবিমূঢ অবস্থায় পড়েছে। একদিকে ‘সুযোগ বুঝে’ মোবাইল অপারেটররা চাচ্ছে নিজেদের ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে। ‘সুযোগ বুঝে’ শব্দটা এ জন্য বলছি যে, এর আগে দুটি রাজনৈতিক সরকারের আমলে বার বার চেষ্টা করেও মোবাইল অপারেটররা নিজেদের পক্ষে পছন্দমতো সিদ্ধান্ত পায়নি। এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যদি কোনোভাবে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করিয়ে নেওয়া যায়, তার একটা প্রচেষ্টা বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে দেশীয় বিনিয়োগে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্ক ট্রান্সমিশন অপারেটর, ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ, ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে এবং ইন্টারন্যাশাল ইন্টারনেট গেটওয়ে অপারেটররা নিজেদের ব্যবসার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়।

কারণ মোবাইল অপারেটররা নিজেদের ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক তৈরির অনুমতি পেলে পুরো ইন্টারনেট ব্যবস্থায় বিশেষায়িত ‘মোবাইল অপারেটর’ সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে সামর্থ্য হবে এবং অন্যসব স্তরে লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিটিআরসির সামনে। দুপক্ষের কাছেই যুক্তি আছে। বিটিআরসি কোনো পক্ষে যাবে বা কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে উভয় পক্ষের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে? তবে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য যে কোনো দেশের উদাহরণ অনুসরণ করার আগে নিজের দেশের বাস্তবতাটা ভালোভাবে বুঝতে হবে।

২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০১ সালের টেলিযোগাযোগ অ্যাক্টের আলোকে আইএলডিটিএস (ইন্টারন্যাশনাল লং ডিসটেন্স টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিসেস) পলিসির মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতে কয়েকটি স্তর সৃষ্টি করা হয় এবং পৃথক লাইসেন্স দেওয়া হয়। যদিও এই গাইডলাইন করা হয়েছিল ভিওআইপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন ব্যবস্থা থেকে সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করার জন্য; কিন্তু এই গাইডলাইনের মাধ্যমে নতুন কয়েকটি স্তর সৃষ্টির মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতে সুনির্দিষ্ট ভ্যালুচেন বা রূপরেখা তৈরি হয়ে যায়। বিশেষ করে ১৯৯৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে দেশের পুরো টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর হিসেবে গ্রামীনফোনের যে একক আধিপত্য ছিল, আইএলডিটিএস পলিসি সেই আধিপত্য ভেঙে দেয়। ফলে সে সময় এই পলিসি বাস্তবায়নের পর শুধু নতুন স্তরগেুলোর জন্য লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সব ব্রডব্র্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং অন্য মোবাইল অপারেটররাও স্বাগত জানায়।

তবে ২০০৮ সালের পরিস্থিতি এখন নেই। গত ১৬ বছরে এর আমূল বদলে গেছে। সে সময়ের টুজি থেকে আজ মানুষ ফোরজি প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছে। পরীক্ষামূলক ফাইভজি প্রযুক্তির ব্যবহারও চলছে। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গত দেশে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে এবং ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ৬৫০ জিবিপিএস থেকে বেড়ে ৬ হাজার জিবিপিএস ছুঁয়েছে। ফলে বিপুল এই রূপান্তরের পর আইএলডিটিএস পলিসির মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া স্তরগুলোর যৌক্তিকতা কতটুকু আছে, সেটা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে সেই প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন পক্ষ যার যার ব্যবসার স্বার্থ অনুযায়ী দিচ্ছে। একটা নিরপেক্ষ উত্তর দরকার। এই নিরপেক্ষ উত্তর পেতে হলে গত ১৬ বছরে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে ভ্যালুচেইন কীভাবে কাজ করেছে, সাধারণ মানুষ কতটা সুফল পেয়েছে, এই ভ্যালুচেনে কি ধরনের জটিলতা আছে, এই ভ্যালুচেনে ঠিক কতটা পরিবর্তন আনতে হবে, তা যথাযথভাবে নির্ধারণের জন্য একটা টেকনিক্যাল অনুসন্ধান দরকার। এই অনুসন্ধানের দায়িত্ব ২০০১ সালের টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী বিটিআরসির।

টেকিনিক্যাল অনুসন্ধানের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে সংশোধন বা পরিবর্তনের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা ছাড়া যে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত একটি ব্যবসায়ী পক্ষকেই লাভবান করবে এবং বিটিআরসিকে বিতর্কের মধ্যে ফেলবে। যেমন এখন মোবাইল অপারেটরদের ডিডব্লিউডিএম কার্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মোবাইল অপারেটরদের যাবতীয় প্রচার-প্রচারণা ছিল নিজস্ব ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক তৈরির অনুমতি পাওয়ার জন্য। প্রথমে মোবাইল অপারেটররা তড়িঘড়ি অবকাঠামো ভাগাভাগির একটা নীতিমালা তৈরি জন্য চাপ দিল। এরপর সেটা নিয়ে বিতর্ক উঠলে নিজেরা ‘ডিডব্লিউডিএম’ ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার জন্য কৌশলগত অবস্থান নিল।

প্রকৃতপক্ষে ‘ডিডব্লিউডিএম’ ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া আর নিজস্ব ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা একই কথা। মোবাইল অপারেটরদের নিজস্ব অপটিক্যাল ফাইবার আছে। সেটাকে সক্রিয় নেটওয়ার্ক করতে হলে দরকার শুধু ‘ডিডব্লিউডিএম’ কার্ড ক্রয় এবং স্থাপনের অনুমতি পাওয়া। আইএলডিটিএস পলিসি অনুযায়ী ‘ডিডব্লিউডিএম’ ক্রয় এবং স্থাপনের অনুমতি শুধু এনটিটিএন অপারেটরদের। অতএব, ছলে বলে কৌশলে মোবাইল অপারেটররা ‘ডিডব্লিউডিএম’ স্থাপনের অনুমতি পেলে টেকনিক্যাল অনুসন্ধান, নীতিমালা পরিবর্তন কিংবা নতুন নীতিমালা তৈরির বিষয়টিও সহজেই পাশ কাটিয়ে রাতরাতি এনটিটিএন অপারেটর হওয়া যায়! একবার এনটিটিএন অপারেটর হতে পারলে নেশনওয়াইড আইএসপিদের ব্রডব্র্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবসাও দখলে নেওয়া হয়ে যাবে সময়ের ব্যাপার মাত্র।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আইএলডিটিএস পলিসির অধীনে প্রদত্ত কমন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক তৈরির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। বড় সংখ্যায় বাংলাদেশি নাগরিকদের কর্মসংস্থান করেছেন। কমন নেটওয়ার্ক কেন্দ্র করে সারা দেশে ৩ হাজারের বেশি আইএসপি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগে আইএসপি খাতেও বিনিয়োগের আকার বেশ বড়। লক্ষাধিক মানুষ এখানে কর্মরত। এই বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কি পাশ কাটানো যায়? মোবাইল অপারেটরদের শর্তহীনভাবে ‘ডিডব্লিউডিএম’ ক্রয় ও স্থাপনের অনুমতি দিলে তো দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিপুল কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ দুটিই বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। এর দায় কে নেবে?

দেশে টেলিযোগাযোগ খাত সম্প্রসারণের ইতিহাসটা যারা ভালো করে জানেন, তাদের নিশ্চয় মনে আছে ২০০৮ সালের পূর্ববর্তী অবস্থা ও পরবর্তী অবস্থার মধ্যে পার্থক্য কত বড়? বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে কম দামে লিজ নেওয়া ফাইবার দিয়ে প্রদত্ত সেবার দাম কত বেশি নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চয় আমরা ভুলে যাইনি। দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটরকে দুই এমবিপিএস ডাটা কানেকটিভিটির জন্য প্রতি মাসে ৮০ হাজার টাকা দাম দিতে হতো। ২০০৮ সালের পর সেই দাম কমতে কমতে ৩০০ টাকায় নেমে এসেছে। ২০০৮ সালের আগে শহর এলাকার বাইরে রেলওয়ে ছাড়া আর কারও ফাইবার নেটওয়ার্ক কার্যত ছিল না। ২০০৮ সালের পর কমন নেটওয়ার্ক তৈরির ফলে সেই নেটওয়ার্ক ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। আইএলডিটিএস পলিসি নিয়ে অনেক সমালোচনা হতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই পলিসি ছাড়া দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটরের মনোপলি ভাঙা সম্ভব ছিল না, বাংলাদেশে এত কম দামে ব্রডব্র্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দেওয়াও সম্ভব হতো না। টেলিযোগাযোগ খাতে দেশীয় উদ্যোক্তা তৈরিও সম্ভব হতো না।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, একটি প্রযুক্তি শুধু একটা পক্ষের জন্য কেন বরাদ্দ থাকবে? আমিও মনে করি, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নীতি শুধু নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারে উন্মুক্ত নীতি গ্রহণ করা উচিত। বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়ায় এমন নীতি গ্রহণ করা উচিত; কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সমান গুরুত্ব দেওয়া দরকার দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য। ভবিষতের ডাটা সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কভিড-১৯ মহামারির পর থেকে আমাদের প্রতিবেশী একাধিক দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, ডাটা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমরা কি টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশীয় কোম্পানিগুলোকেই অস্তিত্বহীন করে দেব?

প্রকৃতপক্ষে কোনো একক পক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ নয়, সরকারের নীতি নির্ধারক এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। আইএলডিটিএস পলিসি সে সময়ে এ খাতের ব্যবসায় মনোপলি ভেঙে দিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য মোটামুটিভাবে সমান সুযোগ তৈরি করেছিল। সময়ের প্রয়োজনে এখন এই নীতি সংশোধন করতে হতে পারে; কিন্তু সেই সংশোধনের আগে কোথায় কতটুকু সংশোধন দরকার, কেন দরকার, তা নির্ধারণ করা জরুরি। এ জন্য টেকনিক্যাল অনুসন্ধানের বিকল্প নেই। সেই অনুসন্ধানের পূর্ব পর্যন্ত আইএলডিটিএস পলিসির অধীনে যে কাঠামো আছে, সেটাই বিদ্যমান রাখা উত্তম সিদ্ধান্ত হবে।

রাশেদ মেহেদী: টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ