‘রাজমহল’ সিনেমা থেকেই আমার গালের তিলের জন্ম
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের নায়িকা রোজিনা (জন্ম ২০ এপ্রিল, ১৯৫৫)। কবরী, শাবানা, সুচরিতা, ববিতাদের মতো কিংবদন্তিতুল্য নায়িকাদেরকালে যিনি রওশন আরা রেণু থেকে রোজিনা হয়ে উঠেছিলেন, রোজিনা নামটি উচ্চারিত হলেই বাংলাদেশের সিনেমাপ্রেমীদের চোখে ভেসে ওঠে এক মিষ্টি মেয়ের হাসিমুখ। সবার আগে চোখে পড়ে তার গালের কালো তিলটির দিকে। আবহমান বাংলার নারীরূপ তার প্রতিচ্ছবিতে।
দীর্ঘ তিন দশক তিনি চলচ্চিত্র জগৎ ধাপিয়ে বেড়িয়েছেন প্রবল ধাপটে। দর্শকদের উপহার দিয়েছেন ‘রাজমহল’, ‘বিনি সুতার মালা’, ‘গাঁয়ের ছেলে’, ‘আনার কলি’, ‘সোহাগ মিলন’, ‘রেশমী চুড়ি’, ‘রসিয়া বন্ধু’, ‘নসীব’, ‘শিরি ফরহাদ’, ‘অন্যায়-অবিচার’, ‘ছুটির ফাঁদে’, ‘শেষ পরিচয়’-এর মতো অসংখ্য অসামান্য সব জনপ্রিয় ছবি। তার অভিনীত ছবির গান- তুমি চোখের আড়াল হও, কাছে কি বা দূরে রও’, ‘ছেড়ো না ছেড়ো না হাত’, ‘তুমি আমার কত চেনা... এখনো হয়তো অনেকের স্মৃতির নাড়া দেয়।
চিরসবুজ চিত্রনায়িকা রোজিনা এসেছিলেন ভিউজ বাংলাদেশ স্টুডিওতে। তার চলচ্চিত্রজীবনের যাত্রা, কীভাবে তিনি রেণু থেকে রোজিনা হয়ে উঠলেন সেসব নিয়ে গল্পের ডালি মেলে দিলেন। গল্পের আসরে তার সঙ্গী ছিলেন ভিউজ বাংলাদেশ সম্পাদক রাশেদ মেহেদী।
ভিউজ বাংলাদেশ: আজকে ভিউজ বাংলাদেশের স্টুডিও বেশ আলোকিত। কারণ একজন কিংবদন্তিতুল্য আলোকিত মানুষ আজ আমাদের সঙ্গে আছেন। আমাদের সঙ্গে আজ আছেন বাংলাদেশের চিরসবুজ নায়িকা রোজিনা। ভিউজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম।
রোজিনা: ধন্যবাদ আপনাকে। ভালো লাগছে আপনাদের এখানে এসে। আপনাদের স্টুডিওটা অনেক সুন্দর। অনেক সময় আপনাদের ভিউজ দেখি। আগে যেমন টেলিভিশন বা পত্র-পত্রিকা দেখা হতো, এখন তো মোবাইলেই সব দেখা যায়। আপনাদের অনেক নিউজ-ভিউজ দেখেছি।
ভিউজ বাংলাদেশ: রোজিনা আসলে বাংলাদেশে একজনই। আপনাদের জন্ম যুগে যুগে হয় না। একবারই হয়। তারপর আপনারা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকেন, আলো ছড়িয়ে যান। আপনাদের অনেকে অনুসরণ করে, শেখে। তারা নিজেরাও আলোকিত হয়। আজকে আমরা খুবই গর্বিত যে আপনি আমাদের স্টুডিওতে এসেছেন। আপনি যখন চলচ্চিত্রে এসেছেন, আশির দশকের প্রথম ভাগে বা সত্তর দশকের শেষ দিকে, তখন পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রের বিশাল একটা ধাপট ছিল, সত্যজিৎ রায়, প্রভাত রায়ের মতো পরিচালকরা তখন কাজ করছেন, আবার আমাদের এখানে জহির রায়হানের পরবর্তী সময়ে আলমগীর কবির, নারায়ণ ঘোষ মিতা, কবির আনোয়ার, শেখ নেয়ামত আলী, আমজাদ হোসেন, কাজী জহির, ফখরুল হাসান বৈরাগী, মতিন রহমান কার নাম বাদ দিয়ে কার নাম বলবো... সেই উজ্জ্বল সময়ে আপনি পদার্পণ করেছেন। একটা সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে আপনি প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। আপনি ওই সময়ে যে একটা বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয় করেছিলেন সেটা খুবই সাহসী ছিল। এখন যখন শোবিজ অঙ্গনের নারীদের পথচলার সাহসের কথা বলা হয় তখন আপনার নামটি আসে ওই বিজ্ঞাপনচিত্রের সাহসের কারণে। তা আজকের আলোনার বিষয় নয়। এরপর আপনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনকে আলোকিত করেছেন, যাকে বলে ধাপিয়ে বেড়ানো, আপনি ধাপিয়ে বেড়িয়েছেন। আমরা সেখান থেকে একটু শুরু করি। আপনি তো একজন সাধারণ রওশন আরা রেণু ছিলেন, সেখান থেকে রোজিনা হলেন কীভাবে?
রোজিনা: চলচ্চিত্রযাত্রা থেকেই আমার নাম রোজিনা হয়েছে। প্রথম আমার যে ছবিটি করার কথা ছিল, ‘মিন্টু আমার নাম’, সেই ছবিতে আমার নাম রাখা হয় রোজিনা। নামটি দিয়েছিলেন সেই সময়ের খুবই শ্রদ্ধেয় একজন মানুষ, মহিউদ্দিন স্যার। তিনি এতই সম্মানীত মানুষ ছিলেন যে সবাই তাকে মহিউদ্দিন স্যার বা সাহেব বলতেন। তখনকার দিনে যারা বড় বড় পরিচালক ছিলেন তারাও ওনাকে স্যারই বলতেন। যে বিজ্ঞাপনচিত্রটির কথা বললেন ওটা দিয়েই আমার চলচ্চিত্রে আসা। রেণু থেকে রোজিনা হয়ে উঠার পেছনে বিরাট একটা জার্নি আছে। ওই গল্পের নায়িকার নামও ছিল রোজিনা, সেখান থেকেই আমার নামও রোজিনা রাখা হয়, যেন দর্শক নামটি মনে রাখতে পারে। প্রেস কনফারেন্সে আমার নাম ঘোষণা করা হয়- নবাগত মুখ রোজিনা; কিন্তু দুঃখের বিষয় ওই ছবি থেকে আমাকে বাদে দেয়া হয়। কেন বাদ দেয়া হয় জানি না। আমার আর ওই ছবিতে অভিনয় করা হয়নি; কিন্তু নামটা রয়ে গেছে। এই নামেই আমি পরিচিত হয়ে উঠেছি। মহিউদ্দিন স্যার নামটি দিয়েছিলেন বলে আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। সব সময় আমি তার কথা বলি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে।
ভিউজ বাংলাদেশ: এফ কবীর চৌধুরীর রাজমহল ছবিতে আপনি প্রথম পূর্ণাঙ্গ নায়িকা হিসেবে আসলেন, ওই ছবিতে আপনার অভিনয়-অজ্ঞিতা সম্পর্কে কিছু বলুন।
রোজিনা: আমি এসেছি কিন্তু চলচ্চিত্রে অভিনয় করার জন্যই। যখন থেকে আমি বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই আমি ছবি দেখতাম। ছবি দেখে দেখেই অনুপ্রাণিত হতাম। আমাদের বাড়ি রাজবাড়ী। আর নানারবাড়ি হলো গোয়ালন্দতে। আমাদের বাড়ির কাছেই একটা সিনেমা হল ছিল। হাঁটাপথে দশ-পনেরো মিনিটের দূরত্ব। পালিয়ে পালিয়ে ছবি দেখেছি। দেখে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই চলচ্চিত্রে আসা। আসা মানে আসার কথা ভাবা। আমার মা কখনোই চাননি যে আমি চলচ্চিত্রে আসি। চলচ্চিত্রে আসার আগেই মা-বাবার সঙ্গে আমি ঢাকা এসেছি। আমার বাবা বিজনেস করতেন। ও কারণেই আসা-যাওয়া। আমার বাবা যার সঙ্গে বিজনেস করতেন, আলী ভাই, আলী ভাই থাকতেন আজিমপুরে। ওনার কথাও বলতে হয়, উনি না থাকলে কিন্তু আমার চলচ্চিত্রে আসা হতো না। উনি সংস্কৃতিমনা ছিলেন। মঞ্চ নাটক করতেন। আলী ভাই যখন আমাদের বাড়ি যেতেন, রাজবাড়ীতে, তখনো ওনার সঙ্গে নাটক-সিনেমা নিয়ে অনেক গল্প হতো। আমি বলতাম, আলী ভাই, আমি অভিনয় করব, শাবানা হব, কবরী হব, ইত্যাদি।
আলী ভাই বলতেন, না, না, খালাম্মা বকবে। মা যখন শুনতেন আমি অভিনয় করব, সিনেমা করব- এগুলো কখনো মেনে নিতে পারতেন না। ছোটবেলায় আমি নানা-নানির কাছে গিয়ে প্রায়ই থাকতাম। একটু বড় হয়ে নানাবাড়ি একাই চলে যেতাম। বেশি দূরে ছিল না তো নানাবাড়ি। আর আমার মা খুব শাসন করতেন। সব সময় চাইতেন আমরা যেন ভালো করে লেখাপড়া করি। মফস্বলের মেয়ে হলেও লেখাপড়ার প্রতি মার খুব কড়াকড়ি ছিল। সংস্কৃতিমনাও ছিলেন, বিশেষ করে গান খুব পছন্দ করতেন, বলতেন, তোমরা গান গাইতে পারো; কিন্তু মেয়ে সিনেমা করবে এটা মানতে পারতেন না।
কদিন দুষ্টুমি করে মার হাতে মার খেয়ে নানাবাড়ি চলে আসি। সিনেমা হলের যিনি অপারেটর ছিলেন তিনি থাকতেন আমাদের বাড়ির পাশেই। আমরা চাচা চাচা বলতাম। মাঝে মাঝে ওনার বাড়ি গিয়ে নেগেটিভে আলো ফেলে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দেখতাম। তো নানাবাড়ি গিয়ে গোয়ালন্দ ফেরিঘাটে দাঁড়িয়ে আছি, দেখি ওই চাচা দাঁড়িয়ে আছেন ফিল্মের ক্যান হাতে। উনি মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে ছবি নিতেন। তিনি আবার আলী হায়দার ভাইকে চিনতেন। উনি বললেন, তুই এখানে? আমি বললাম, ঢাকায় যাব, আলী হায়দার ভাইদের বাসায়। উনি বললেন, তোর মা জানে? আমি বললাম, হ্যাঁ, মা জানে। ওনার সঙ্গে ঢাকা চলে আসলাম।
এখন যেমন ঢাকায় আসা সহজ, তখন এতটা সহজ ছিল না। এত ব্রিজ ছিল না। সব নদীতে ফেরি। যখন যাত্রা শুরু করি তখন সকাল নটা-দশটা বাজে, আসতে আসতে রাত নয়টা-দশটা বেজে গেছে। আলী ভাইয়ের মা দেখে বললেন, তুমি একা! আমি বললাম, এসেছি একটা কাজে। তারা তো আর জানতেন না আমি পালিয়ে এসেছি; কিন্তু দুদিন পর মা-বাবা যখন জানতে পারলেন আমি নানাবাড়িতেও নাই, তখন তো বুঝতেই পারেন কী অবস্থা! চাচা যখন দুচার দিন পরে দেশে গেছেন তখন শুনে আমি নিখোঁজ। চাচা বললেন, ও তো আমার সঙ্গেই ঢাকা গেছে। আলীদের বাড়ি আছে। সেখান থেকেই আলী ভাই আমাকে নাটকে নিয়ে গেলেন, মঞ্চ নাটক করতে করতে এক সময় চলচ্চিত্রে যাত্রা। তো এভাবেই আমার চলচ্চিত্রে আসা।
ভিউজ বাংলাদেশ: বলতে পারেন একজন আটপৌঢ়ে মানুষ থেকে আপনি ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রথম অনুভূতিটা কেমন ছিল?
রোজিনা: প্রথম আমি মুভি ক্যামেরার সামনে আসি ‘জানোয়ার’ ছবিতে। কোনো শুটিংয়ের প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। ওই ছবির হিরো ছিলেন ওয়াসিম ভাই, আর হিরোইন ছিলেন সূচরিতা ম্যাডাম। পরিচালক ছিলেন কালীদাস বাবু। সংসদ ভবনের সামনে খেঁজুর বাগানে শুটিং চলছিল। আমরা গিয়েছিলাম শুটিং দেখতে। আমাকে দেখে ডেকে একটা পাসিং শটের জন্য দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। ওই শুটিংয়ের জন্য ১০ টাকা পেয়েছিলাম।
তারপর হলো কি, আলী ভাইরা একটা বাৎসরিক নাটকের মহড়া দিচ্ছিলেন। আমিও মহড়া দেখতে যেতাম। পরে একদিন শুনি নাটকের নায়িকা অসুস্থ। তখন আলী ভাই বললেন, রেণু, তুই কর। আমি দুই-তিন দিন রিহার্সাল করি। ওই নাটকের পর আরও কয়েকটা মঞ্চনাটক করি। অনেক নাট্যকার-পরিচালকদের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেখান থেকেই পরে ওই বিজ্ঞাপনটা করা।
ভিউজ বাংলাদেশ: রাজমহলে আপনার অভিষেক কীভাবে হলো? ওটা তো আপনার মাইলস্টোন ছবি।
রোজিনা: ‘মিন্টু আমার নাম’ থেকে যখন আমি বাদ গেলাম তখন অনেক খারাপ লেগেছে। অনেক কেঁদেছিলামও। মা বলেছিলেন, এখন কাঁদলে চলবে না। আমি তো বলেছিলাম তুমি এসবে যাবি না। যখন এসেছোই তখন তোমাকে শক্ত হতে হবে। তোমাকে এগিয়ে যেতে হবে। এটা আমাকে অনেক সাহস দেয়। আমি লেগে থাকি।
‘রাজমহল’ ছবির পরিচালক এফ এ কবির চৌধুরী ভাই। একদিন কবির ভাইয়ের সহকারী এলেন আমাদের বাসায়। আমরা তখন মোহাম্মদপুর থাকি। ফ্যামিলির সঙ্গেই। তো কবির ভাইয়ের সহকারী এসে বললেন, আমাকে একটু ওনাদের অফিসে যেতে হবে। আমি বললাম, না, আমি কারও অফিসে যাব না। আমাকে নিতে হলে আমার বাসায় আসতে হবে, আর আমাকে একক নায়িকা নিতে হবে।
তারপর একদিন কবির ভাই আমাদের বাসায় আসলেন। কবির ভাইকে তখন আমি চিনতাম না। উনি এসে যখন দরজায় নক করলেন আমিই দরজা খুলে দিলাম। উনি বললেন, রোজিনা কে? মিন্টু আমার ভাই ছবিতে আমি অভিনয় না করলেও নামটা ছড়িয়ে গিয়েছিল। আমি কবির ভাইকে বললাম, ‘মিন্টু আমার ভাই’ ছবিতে আমাকে নিয়েও বাদ দেয়া হয়েছে, অন্য হিরোইন নেয়া হয়েছে, এতে আমার মনে একটা ক্ষোভ জন্ম হয়েছে। এ জন্য আমি কারও অফিসে যেতে চাই নাই। এটা শুনে কবির ভাই হা হা করে হাসলেন। আজকে তিনি নাই, ওনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। দশ দিনের মাথায়ই তিনি আমাকে নতুন একটা ছবিতে কাস্ট করলেন। এক মাসের মধ্যেই গল্প লেখা হয়ে গেল। ওয়াসিম ভাই ছিলেন হিরো। তখন তো তিনি খুব ব্যস্ত। ওয়াসিম ভাইও আজ আমাদের মাঝে নেই। তার কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত নসিব করেন। তিনি আমাকে অনেক হেল্প করেছেন। কখনো বুঝতে দেন নাই যে আমি নতুন, আর তিনি এত বড় আর্টিস্ট।
তিন-চার মাসের মধ্যেই রাজমহল ছবির শুটিং শেষ হয়ে গেল। রাজমহল ছবি থেকেই কিন্তু আমার গালের তিলের জন্ম। এর পেছনে একটা ঘটনা আছে। ওই ছবির শুটিংয়ের আগে আমার চিকেনপক্স হয়েছিল। আমি তো ঘাবড়ে গেছি, আল্লাহ, সামনের মাসে শুটিং, এখন এসব কী হলো! নানা চিকিৎসায় পাঁচ-ছয় দিনেই ভালো হয়ে গেলাম; কিন্তু গালের একটা দাগ একটু ডিপ হয়ে গিয়েছিল। শুটিংয়ে গিয়ে মেক-আপ দিয়েও দেখা গেল ডিপই রয়ে যাচ্ছে। ফাউন্ডেশন দিয়েও ঠিক হচ্ছে না। জামান ভাই ছিল মেক-ম্যান। তিনি একটা তিল লাগিয়ে দিলেন ওই দাগে।
ছবিটা যখন মুক্তি পায় তখন অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অপারেশন করাতে গিয়ে আমি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। আনন্দ সিনেমাহলের পাশেই ছিল ওই হাসপাতাল। হাসপাতাল থেকেই দেখছি সিনেমাহলের সামনে বিশাল ব্যানারে আমার ছবি। অনেকে এসে খবর দিতে লাগলেন, তোমার ছবি তো সুপারহিট! ওই যে শুরু হলো আমার যাত্রা, তারপর থেকে আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ভিউজ বাংলাদেশ: তখন অনেক জনপ্রিয় নায়িকারা কাজ করছেন, কবরী, সূচরিতা, শাবানা, ববিতা- ওনারা সবাই আছেন, এই যে আপনার স্বপ্নের হিরোইনদের সঙ্গে আপনি পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন, কেমন ছিল এই অনুভূতি?
রোজিনা: না, আমি কখনো পাল্লা দিয়ে অভিনয় করিনি। ওনারা আমার অনেক সিনিয়র। আমরা তখন নিজের কাজটাই করে গেছি। সহশিল্পী হিসেবেও শাবানা ম্যাডামের সঙ্গে, ববিতা ম্যাডামের সঙ্গে অনেক ছবিতে কাজ করেছি। প্রথমে তো একটু ঘাবড়েছি ঠিকই, স্বাভাবিক; ওনারা এত বাঘা অভিনেত্রী! ওনারা অনেক সহযোগিতা করেছেন। সহযোগিতা না করলে কাজ করাটা দুষ্কর হতো।
ভিউজ বাংলাদেশ: ওই সময়টা যখন ববিতা, সূচরিতা, কবরী ওনারা সবাই আছেন, তখন আপনি শক্তি সামন্তের ‘অন্যায় অবিচার’ ছবিতে কীভাবে কাজ করার সুযোগ পেলেন? মিঠুন চক্রবর্তীর নায়িকা হয়ে…
রোজিনা: আমি আসলে জানি না এটা কীভাবে হলো! এখন যেমন অনেকে বলে না সুপারস্টার, কী কী এটা-সেটা, তখন এসব আমরা জানতাম না। আমরা শুধু কাজ আর কাজ করে গেছি। তখন রেওয়াজটাই ছিল এরকম। অনেক ধরনের ছবি হতো, ফোক ছবি, সামাজিক ছবি, সামাজিক অ্যাকশন ছবি। ওয়েদার ভালো থাকলে একসঙ্গে চার-পাঁচটা ছবি নিয়ে আমরা আউটডোরে যেতাম। তখন আমি কক্সবাজার ছিলাম। তিন-চার মাস একটানা কক্সবাজার শুটিং করছি। একদিন আমার অ্যাসিসটেন্ট এসে বলল, আপা, হাসান ভাই এসেছেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে। হাসান ভাই মানে হাসান ইমাম। আমিই এগিয়ে গিয়ে ওনাকে নিয়ে আসলাম। ওনাকে খুব শ্রদ্ধা করতাম আমি। তখনকার বয়জ্যেষ্ঠরা আমাদের তুই-তুমি করেই বলতেন। উনি বললেন, বম্বের সঙ্গে আমরা কো-অপারেশনে একটা ছবি করছি। তুই ওটার হিরোইন। মিঠুন চক্রবর্তী থাকবে তার বিপরীতে। তখন তো মিঠুন চক্রবর্তী খুবই সুপারহিট হিরো। ওনার ডিস্কো ড্যান্সার ছবিটা তখন মুক্তি পেয়েছে। তারপর পরিচালক শক্তি সামন্তের সঙ্গেও কথা হলো। তিনি মাস দুয়েক পরে ২০ দিনের শিডিউল চাইলেন।
তখন আমি ভাবতে লাগলাম, আমি তো হিন্দি জানি না, মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে কাজ করতে পারব না। তা ছাড়া আমরা কাজ করি প্রমট করে, শুনেছি ওনারা প্রমট করে না, এসব ভেবে আমি হাসান ভাইকে বললাম, হাসান ভাই, আমি ছবিটা করব না! উনি বললেন, কেন? আমি বললাম, আমি তো হিন্দি জানি না, প্রমট জানি না। হাসান ভাই বললেন, মিঠুন বাঙালি, অসুবিধা নেই, আর তোর জন্য প্রমটের ব্যবস্থা করা হবে। তাও আমি ছবিটা করতে চাইনি। কেমন যেন ভয় পাচ্ছিলাম; কিন্তু ওনারাও নাছোড়বান্দা, আমাকে নিবেই, কারণ তখন শাবানা, ববিতা, রোজিনাকে নিলেই আগে থেকে হল বুকিং হয়ে যেত।
যাই হোক, ছবিটা শেষ পর্যন্ত করতে রাজি হলাম। হেলিকপ্টারে কুয়াকাটা যাব। আমি রেডি হয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে গেলাম। আমি গাড়ি থেকে নামতেই দেখি হাসান ভাই, শক্তি সামন্ত, মিঠুন চক্রবর্তী দাঁড়িয়ে আছেন। মিঠুন চক্রবর্তী পঞ্চাশ-ষাট গজ দূরে হেলিকপ্টারের সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই দৌড়ে আসলেন, আরে, রোজিনা! তুমি আমাকে দেরি করিয়ে দিলে, জানো, আমার কী ভুখ লেগেছে!
হেলিকপ্টারে যেতে যেতে আমরা এত ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম, উনি এত গল্প করলেন, আমি ইজি হয়ে গেলাম। কত বড় মানুষ! ভাবি, এরাই তো মানুষ! কত সহজে সবাইকে আপন করে নিতে পারেন!
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে