১ টাকা যদি পেতাম তাহলে তো সেই ঈদ সীমাহীন
দিলারা জামান বাংলাদেশের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী। বাংলাদেশের মানুষ তাকে এক নামেই চেনেন। ষাট বছরের অধিক সময় ধরে তিনি মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের অভিনয় করছেন সুনামের সঙ্গে। আমাদের দেশের অভিনয় শিল্পের, বিশেষত নারী অভিনয়শিল্পীদের পথিকৃত তিনি। বাংলাদেশের কালজয়ী সব নাটক ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘বারোরকমের মানুষ’ ইত্যাদি নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি অভিনয় করেছেন অসংখ্য চলচ্চিত্রে। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো: চাকা, আগুনের পরশমণি, চন্দ্রগ্রহণ, মনপুরা, লাল মোরগের ঝুঁটি ইত্যাদি। অভিনয়ে স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও একুশে পদক। ৮১ বছর বয়সেও তিনি অভিনয় করে যাচ্ছেন। ঈদ আনন্দের বিশেষ আয়োজনে ভিউজ বাংলাদেশের সঙ্গে কথা হলো এই কিংবদন্তি অভিনয়শিল্পীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কামরুল আহসান।
ভিউজ বাংলাদেশ: কেমন আছেন?
দিলার জামান: জ্বি, ভালো আছি। এ বয়সে যেমন থাকা যায়। ৮১ বছর চলছে, এখনো কাজ করতে পারছি এটাই বড় কথা। এখন কাজ করতে করতে যেতে পারলেই বাঁচি।
ভিউজ বাংলাদেশ: ছোটবেলায় আপনাদের ঈদ কেমন ছিল?
দিলারা জামান: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবই বদলে গেছে। পৃথিবীটা এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে। সারাবিশ্বই এখন হাতের মুঠোয়। অনেক দেশের সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে ঢুকে গেছে। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিও আমরা এখন গ্রহণ করছি। আমাদের ছোটবেলায় তো এত জানার সুযোগ ছিল না। ঈদ ছিল ক্ষুদ্র পরিসরে। যদিও তার মধ্যে আনন্দ ছিল অতুলনীয়। ছোটবেলায় আমরা একটা জামা পেতাম। একটা স্যান্ডেল বা জুতা। সেগুলো লুকিয়ে রাখতাম। তারপর ঈদের দিন সেগুলো পরে আশপাশের সবার কাছে গিয়ে সেলামি চাইতাম। চার আনা, আট আনার একটা সিকি পেতাম। নোট তো তখন ছিল না। ১ টাকা যদি পেতাম তাহলে তো সেই ঈদ সীমাহীন। ভাইবোনরা, পাড়ার বন্ধুরা কে কত টাকা সেলামি পেল তা নিয়ে হিসেবে বসতাম। এই আনন্দ তো বলে বোঝানো যাবে না।
ভিউজ বাংলাদেশ: ঈদের দিন কী খেতেন আপনারা?
দিলারা জামান: সকালে সেমাই খেতাম। সেই সেমাই এখনকার মতো বাজারের সেমাই না। নিজের হাতে বানিয়ে নিতে হতো। সেমাই বানানোর মেশিনে ঈদের আগে হাতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেমাই বানানো হতো। আম্মার সঙ্গে আমরাও সেই মেশিনের চাকা ঘুরাতাম। সেই সেমাই বানিয়ে আবার রোদে শুকাতে হতো। এগুলো অনেক আগের কথা। ১৯৪৭ সালের আগে-পরে। যখন আমরা আসানসোল থাকতাম, পরে আসানসোল থেকে যখন যশোর চলে আসি সে সময়ের কথা। এখন তো নানারকম সেমাই। ঘিয়ে ভাজা। চট করেই তৈরি করা যায়। আগে এরকম ছিল না। তখন সেমাই খাওয়াও একটা বিশাল আয়োজনের ব্যাপার ছিল। দুপুরে খেতাম মোরগ-পোলাও-গরু বা খাসির মাংস। জর্দা। ফিরনি। পায়েস। ঘরে তৈরি পিঠাও থাকতো নানারকম।
ভিউজ বাংলাদেশ: আপনারা ঢাকা এলেন কবে? ঢাকায় এসে আপনার কীরকম অনুভূতি হলো?
দিলারা জামান: আমরা ঢাকা আসি ১৯৫৩ সালে। ঢাকায় এসে আমি বাংলাবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন তো চারদিকে যা-ই দেখি তা-ই অসীম কৌতূহল সৃষ্টি করে। মনে আছে, নিউমার্কেট দেখতে যেতাম। বিশাল গেটটা যখন তৈরি হচ্ছিল আকাশের দিকে তাকিয়ে গেটটাকে দেখতাম, সেটাও একটা দর্শনীয় ব্যাপার ছিল। আমরা তখন আজিমপুর কলোনিতে থাকতাম, দলবেঁধে আসতাম সবাই হেঁটে হেঁটে।
ভিউজ বাংলাদেশ: আচ্ছা, এখন বলুন তখন ঢাকার ঈদ কেমন ছিল আর এখনই-বা ঈদ কেমন লাগছে?
দিলারা জামান: ঢাকায় এসেই বুঝতে পারি ঈদ একটা চাকচিক্যের ব্যাপারও। অনেকরকম মানুষের সঙ্গে জানাশোনা হয়। তখন ঈদের বাজার করতে যেতে হতো সেই ইসলামপুর। কাপড় কিনতাম অমৃত বস্ত্রালয় থেকে। আরও কী কী দোকান ছিল। সেখান থেকে কাপড়, ফ্রক এগুলো কেনা হতো। তাও একটা-দুটার বেশি না। এখন তো সকালে কী পরবে, দুপুরে কী পরবে, বিকেলে কী পরবে- সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একেকটা কাপড় পাল্টায়। বিদেশি ডিজাইন দেখে কাপড় বানানো হয়। কারও সঙ্গে কারও পোশাক যেন না মিলে সেই দিকে খেয়াল। আমাদের সময় আমরা এত কিছু বিচার করতাম না। তবে, ডিজাইনের একটা চল ছিল। তখনকার সিনেমার নায়িকাদের পোশাক দেখে ওগুলো সেলাই করে দিতেন মায়েরা। আম্মাও আমাদের ফ্রক একটু ডিজাইন করে সেলাই করে দিতেন।
ভিউজ বাংলাদেশ: এবার আপনার কলেজ-জীবন ও কর্মজীবনের শুরু দিকের কথা কিছু বলুন।
দিলারা জামান: বাংলাবাজার গার্লস স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে আমি মেট্রিক পাস করি। সেখান থেকে ভর্তি হলাম ইডেন কলেজে। মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েই শাড়ি পরা শুরু করলাম। এই শাড়ি পরেই তখনকার যত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিয়েছি। ৬০ সালে আমি আইএ পাস করি। তখন আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে আমরা একই ব্যাচে ছিলাম। ইডেন কলেজে ছাত্রী পরিষদে সে ভিপি ছিল, আমি সাহিত্য সম্পাদিকা ছিলাম। লেখালেখি করতাম সেই হিসেবে আর কি। দুইজন একসঙ্গে অনেক ঘোরাঘুরি করেছি। আমতলায় মিটিং সেরে রাত করে হলে ফিরেছি। ওইসব দিনগুলো খুব মনে পড়ে। একটা বিষয় ভাবলে অবাক লাগে তখন শাড়ি পরে কী করে দৌড়াতাম! যখন পুলিশ দৌড়ানি দিত, শাড়ি পরেই তো দৌড়েছি। এখন তো মনে হয় হাঁটতে গেলেও হোঁচট খেয়ে পড়ে যাব।
ভিউজ বাংলাদেশ: আপনার অভিনয়-জীবনের শুরুর দিকে কথা কিছু বলুন। কেমন ছিল সেই সময়ের নাটক?
দিলারা জামান: আমি যখন অভিনয় শুরু করি তখন মুসলমান মেয়েরা তেমন অভিনয় করতই না বলা চলে। যারা যাও করতেন, তারাও অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয়ার কথা ভাবতেই পারতেন না। কয়েকজন অভিনয় শিল্পী ছিলেন, তারাও সব সময় যে কাজ করবেন তেমন না। অফিসপাড়ায় বছরে যেসব নাটক হতো সেখানে তারা অভিনয় করতেন আর কি। স্কুলে পড়ার সময় প্রথমে আমি অভিনয় করি। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের মামী চরিত্রে। তারপর কলেজে এসে বার্ষিক অনুষ্ঠানে টুকটাক অভিনয় করতাম। ওখান থেকেই রেডিওতে আসি। তখন রেডিওতে সাহিত্য-অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করতাম। দুপুরের বেলায় গল্পের আসর হতো। এগুলো তখন সরাসরি সম্প্রচার হতো, আগে রেকর্ড হতো না। ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার বিয়ে হয়, সে বছরই ডিসেম্বর মাসে চালু হয় পাকিস্তান টেলিভিশনের পূর্ব পাকিস্তান বিভাগ। কয়েক ঘণ্টার জন্য চলতো তখন। সরাসরি সম্প্রচার। মোহাম্মদ যাকারিয়া ছিলেন তখন, শহীদ কাদের, আমার স্বামীর বন্ধু, জানতেন যে আমি অভিনয় করি, আমাকে নিয়ে আসলেন। আমি ডাকসুর নাটকে অভিনয় করেছিলাম। আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘মায়াবি প্রহর’ নাটকে। সেখানে অনেক প্রশংসা পেয়েছিলাম। কাগজে নামটাম দেখে অনেকেই জানলেন যে দিলারা অভিনয় করে।
টেলিভিশনে তখন ছোট ছোট একাংকিকা হতো, দশ-পনেরো মিনিটের বা সরকারি প্রেমোশনাল কোনো নাটক, আমি সেগুলোতে অভিনয় করতাম। তখন ডিআইটি ভবনে ছিল টেলিভিশন অফিস। কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রচার হতো। সন্ধ্যা ৬ থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলতো বোধহয়। তখন নাটক হতো সাংঘাতিক পরীক্ষার মতো। সেই দুপুর ২টায় গিয়ে স্ক্রিপ্ট রিহার্সাল করে, ড্রেস রিহার্সাল করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হতো। একবার সম্প্রচার শুরু হলে আর নড়াচড়ার সুযোগ থাকতো না। ড্রেস পাল্টাতে হলেও অন্য কারো দৃশ্যের মাঝে এক মিনিট সময়ের মধ্যে পাল্টাতে হতো। সেই নাটকগুলোও লেখা হতো এভাবে যে কাপড় বদলানোর মতো সময় থাকে! সাংঘাতিক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে আমাদের কাজ করতে হতো আর কি। টেলিভিশনে প্রথম নাটকে অভিনয় করি ১৯৬৬ সালে, ‘ত্রিধরা’ নাটকে। এই নাটকে আমার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর স্ত্রী লিলি চৌধুরী। তারপর সে সময় মমতাজ বেগমের লেখা ধারাবাহিক নাটক ‘সকাল-সন্ধ্যা’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। আমি এই নাটকে অভিনয় করেছিলাম।
ভিউজ বাংলাদেশ: সে সময় নাটক করতে গিয়ে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কীরকম মোকাবিলা করেছেন?
দিলারা জামান: তা তো অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিলই। আমার বাবা-মাকেও শুনতে হয়েছে, এই মেয়ে নাটক করে, এর তো বিয়ে দিতে পারবেন না। আমার আব্বা-আম্মা অনেক সংস্কৃতিমনা ছিলেন বলে আমাকে এসব কাজে বাধা দেনননি। একটা কথা আমি সব সময়ই বলি, তখন ডাকসুর নাটক করতে গিয়ে আমি কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তখন শ্রদ্ধেয় মুনীর চৌধুরী স্যার আব্বাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। আব্বা সেই চিঠি পড়ে বললেন, ‘এত বড় মানুষ চিঠি লিখেছেন, যাও, করো’। তখন সেই ‘মায়াবী প্রহর’ নাটকটি করি।
আত্মীয়স্বজনও খারাপ কথা বলেছে। পত্রিকায় ছবি প্রকাশ হলে আব্বা-আম্মাকে নানা কথা বলত। এক সময় আমি স্কুলে পড়াতাম। সেখানেও অনেক কথা শুনতে হতো। এর জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং কাজগুলো করতে পারিনি। ভাবতাম পত্রিকায় ছবি আসলে, খবর আসলে হয়তো নানা কথা ছড়াবে। অনেক শিক্ষকও বলতেন, উনি অভিনয় করেন, ওনার কাছ থেকে বাচ্চারা কী শিখবে? পরে কিছুটা অভিমানবশতই ২০০১ সালে আমি চাকরিটা ছেড়ে দেই। তারপর থেকে অভিনয় নিয়েই আছি। এভাবে একটু একটু করতে করতে এতদূর এসেছি।
ভিউজ বাংলাদেশ: এখন কেমন দেখছেন টেলিভিশন নাটকের জগত? নাটকের মান কি আর আগের মতো আছে?
দিলারা জামান: এখন তো টেলিভিশন নাটক একটা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এত টেলিভিশন চ্যানেল, এত অভিনেতা-অভিনেত্রী। এত মানুষ নাটককে পেশা হিসেবে নিতে পারবে এটা তো আমরা ভাবতেই পারতাম না। শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রী নয়, অন্যান্য কলাকুশলীদেরও জীবন-জীবিকার পথ সুগম হয়েছে। নাটকের মান সম্পর্কে নিয়ে বলতে গেলে…সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে গেছে, মানুষের রুচি বদলে গেছে। নাটক তো আমাদের জীবনের দর্পণ। আগে প্রত্যেকটা নাটকের মধ্যে আমাদের জীবনের, পরিবারের গল্প ছিল, এখন কেমন যেন অনেকটাই শুধু বিনোদননির্ভর। মানুষের জীবনের তো অনেক কষ্ট বেড়েছে, সমস্যা বেড়েছে- এখনকার নাটক সেসব দিকে খুব একটা যেতে চায় না; কিন্তু এসব দেখেই তো সাধারণ মানুষ জীবনসম্পর্কে একটা শিক্ষা পায়। ভাবে কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়। আমি কাউকে দোষ দেই না। এটা হয়তো সময়েরই দাবি। আবার হয়তো এমন সময় আসবে যখন মানুষ নাটক নিয়ে গভীরভাবে ভাববে। আরেকটা বিষয় এখন খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেকে যশ-খ্যাতি পেয়ে যাচ্ছে। এত ভিউ! এটা সবাইকেই প্রভাবিত করছে। ফলে চারদিকেই কেমন একটা অস্থিরতা। কত দ্রুত কত জনপ্রিয় হওয়া যায় সেই চিন্তা। কাজটা ভালো হলো কি না তা নিয়ে খুব চিন্তা নেই। তবে এখনো অনেক গুণী নাট্যকার-পরিচালক ও অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন, যারা অনেক ভালো কাজ করছেন।
ভিউজ বাংলাদেশ: সেই সময়ের সংস্কৃতি সম্পর্কে যদি একটু বলতেন। নারীদের চলাফেরা কীরকম ছিল? সমাজে কি এত অনিরাপত্তা ছিল নারীদের আজকে যেরকম…?
দিলারা জামান: না, আজকের মতো এত অনিরাপত্তা ছিল না। এখন যেমন অনেকক্ষেত্রে নারীদের অধিকার, কর্মক্ষেত্র বেড়েছে; কিন্তু সমাজে সেরকম নিরাপত্তা বাড়েনি। দৃষ্টিভঙি অনেক বদলে গেছে। আগে যেমন সমাজে একটা নীতি-আদর্শ ছিল, এখন সেরকমটা নেই। পারিবারিক বন্ধনগুলোও অনেক শিথিল হয়ে গেছে। আগে পরিবার থেকে মেয়েদের যেমন শাসন করা হতো, এখন সেটাও একটু কমে গেছে। মেয়েদের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টিভঙিও বদলে গেছে। আগে যেমন মেয়েদের আলাদা সম্মান, শ্রদ্ধার চোখে দেখা হতো এটাও বোধহয় একটু কমে গেছে বলে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়। আমার মনে আছে, আগে রাত নটা-দশটা বেজে গেছে, কার্জন হলে মিটিং শেষ করে একা একা রিকশায় করে হলে ফিরছি, একটুও ভয় লাগতো না। এখন তো ঘর থেকে বেরোতেই ভয় লাগে। বাড়ির সামনে দোকান থেকে কিছু কিনব তাও ভয় লাগে। সারাক্ষণ মনে হয় এই বুঝি কেউ ব্যাগটা নিয়ে দৌড় দিল।
ভিউজ বাংলাদেশ: আপনি তো আমাদের লিজেন্ড। আপনি অনেক কিছু দেখেছেন। আপনাকে দেখে দুতিনটি প্রজন্ম বড় হয়েছে। এখন তো আমাদের সমাজ অনেক অসহিষ্ণু হয়ে গেছে। এই পরিবর্তনটা আপনার মনে কীরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে?
দিলারা জামান: অসহিষ্ণু বলতে কারোরই ধৈর্য নেই। রস্তায় বেরোলে সবার প্রতিযোগিতা, কার আগে কে যাবে! সামনে একটা গাড়ি আটকে আছে, হয়তো জ্যামে পড়েছে, সামনে রাস্তা খোলা পেলে চলে যাবে, কিন্তু পেছনে যে গাড়িটা আছে সে সমানে হর্ন দিচ্ছে। এই হর্নের কারণে যে অন্যের ক্ষতি হচ্ছে এই জ্ঞানটা পর্যন্ত নেই। মানুষের প্রতি মানুষের এই যে অশ্রদ্ধা, এটা কিন্তু আগে ছিল না। এগুলো আমাকে খুব কষ্ট দেয়।
এত অল্প সময়ের মধ্যে আমরা সব কিছু এভাবে বিসর্জন দিয়ে দিলাম এটা ভাবলে আমি খুব কষ্ট পাই। আমাদের স্বাধীনতা এভাবে বিফলে গেল! আমাদের অনেক দূরে যাওয়ার কথা ছিল। মালয়েশিয়া স্বাধীন হয়েছে আমাদের অনেক পরে। আজকে ওরা কোথায় আর আমরা কোথায়? ন্যায়-নীতি, নাগরিক অধিকার সবকিছুতেই ওরা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। এসব ভাবতে গেলে আমার খুব কষ্ট লাগে।
ভিউজ বাংলাদেশ: ভিউজ বাংলাদেশকে সময় দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। দেশের মানুষ আপনাকে এক নামে চেনে, ভালোবাসে। জীবনের এ পর্যায়ে এসে অভিনয়জীবনের প্রাপ্তি নিয়ে যদি কিছু বলতেন।
দিলারা জামান: দেশের মানুষকে ভালোবেসে, নাটককে ভালোবেসে এত দূর এসেছি এটাই আনন্দ। আজকে আমার যেটুকু অর্জন, জাতীয় স্বীকৃতি তো আছেই তার চেয়ে বড় স্বীকৃতি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। ইন্ডাস্ট্রির সবাই আমাকে মা ডাকে, কেউ দাদি ডাকে, পথেঘাটে অনেকে মা-দাদি ডেকে কথা বলতে এগিয়ে আসে, এই যে পরিচয়টা, মানুষের মনের মধ্যে থাকতে পারা- এটাই আমার জীবনের সার্থকতা।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে