Views Bangladesh Logo

পিলখানা হত্যাকাণ্ড: ঘটনার স্বরূপ উদ্ঘাটনের অপেক্ষা

Kamrul  Hasan

কামরুল হাসান

০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ঢাকার পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে ঘটেছিল দেশের ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। সেদিন পিলখানায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। একক কোনো ঘটনায় এতজন সামরিক কর্মকর্তার হত্যা এর আগে পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও অজানাই রয়ে গেছে এ ঘটনার পেছনে কী অভিসন্ধি কাজ করেছিল।

গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর পিলখানা হত্যাকাণ্ড পুনর্তদন্তে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত বছর ডিসেম্বরে গঠিত এই কমিশনকে পিলখানায় সংঘটিত ঘটনার প্রকৃতি ও স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে তিন মাস সময় দেয়া হয়েছে। সে হিসাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা এখন দিন গুনছেন ঘটনার স্বরূপ উদ্ঘাটনের।

এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আজ থেকে প্রতি বছর ২৫ ফেব্রুয়ারিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ১৬ বছর পরে ‘গ’ ক্যাটাগরির হলেও এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত যে নেয়া হয়েছে, তাকে স্বাগত জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পাশাপাশি এ হত্যাকাণ্ডের পেছনের হীন চক্রান্ত সবার কাছে প্রকাশ ও প্রকৃত অপরাধীদের বিচার নিশ্চিতের আশাও ব্যক্ত করেছেন নিহত সেনা স্বজনরা।

এবারের এই দিবস নিহত সেনা স্বজনদের কাছে নানাভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ। তারা বলছেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা নেয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ঘটে এই হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনার তদন্ত এবং বিচার কার্য চলেছে আওয়ামী লীগ সরকারের তত্ত্বাবধানেই। সরকার পতনের পরে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করার সুযোগ পান তারা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকার গঠন করে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন।

হত্যাকাণ্ডসহ সংঘটিত অপরাপর অপরাধ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলা ও সংশ্লিষ্ট মামলায় অভিযুক্তদের দায় বা অপরাধ অক্ষুণ্ণ রেখে সংশ্লিষ্ট মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এমন প্রকৃত অপরাধীদের তদন্ত প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে কমিটিকে নির্দেশনা দেয়া হয়। ফলে সুবিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

বিডিআর কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ফয়জুল হক বলেন, ‘এটি আশাব্যঞ্জক যে, নতুন করে কমিশন গঠন করে তদন্ত হচ্ছে এবং এর প্রধান করা হয়েছে সাবেক বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানকে। এদিকে বেশ কিছু বিডিআর জাওয়ান, যারা কি না অন্যায়ভাবে এই মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে ছিলেন, তারাও জামিন পাচ্ছেন। কিছু সুসংবাদ আছে; কিন্তু তদন্ত প্রক্রিয়া খুব ধীর। যাই ঘটুক না কেন, বাস্তবতা হলো গত ১৬ বছরেও আমরা বের করতে পারিনি প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিল, কারা কীভাবে জড়িত। আবার নানা ধরনের গুঞ্জনও আছে। আমরা আশা করি, দ্রুত তদন্ত শেষে জড়িতদের চিহ্নিত করে, ষড়যন্ত্র উন্মোচিত করে বিডিআরের নামে যে কলঙ্ক লেপে দেয়া হয়েছে, তা মেটানো হবে।’

এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ‘শহীদ সেনা অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি নতুন সংগঠন করা হয়েছে। এই সংগঠন করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের অবদান তুলে ধরা, তাদের স্মৃতি ধরে রাখা এবং শহীদ পরিবারগুলোর কল্যাণে কাজ করা। একই সঙ্গে সংগঠটির দাবি, এ হত্যাকাণ্ডের যারা নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নেড়েছেন, তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা।

সংগঠনের আহ্বায়ক পিলখানায় নিহত শহীদ কর্নেল মজিবুর হকের স্ত্রী নাহরিন ফেরদৌস বলেন, আমাদের তিনটি চাওয়া ছিল। ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা করা, দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা ও শহীদদের মর্যাদা। দিনটিকে শহীদ সেনা দিবস হিসেবে ঘোষণা করায় আমরা আনন্দিত। তবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কুশীলবদের বিচারের আওতায় আনতে হবে, যারা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে, তাদের ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে রাজনীতিবিদ ও সেনাবাহিনীর যেসব কর্মকর্তা নেপথ্যে থেকে ষড়যন্ত্র করেছে- তাদের বিচারের আওতায় সর্বাত্মক গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি এই ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় বিশেষ আদালত থেকে ১৭৮ জন আসামির জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে, জেলের মধ্যে যেসব জওয়ানের মৃত্যু হয়েছে তাদের বিষয়ে সঠিক তদন্তের দাবি করেন।

এর আগে পিলখানা হত্যাযজ্ঞে নিহত সাবেক বিডিআরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদ ভূঁইয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ডের যারা নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নেড়েছেন, তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। যেহেতু ঘটনাটি কমিশন তদন্ত করছে, এই নেপথ্যের খলনায়কদের যেন জাতির সামনে আনা হয়। আমরা ইতোমধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদসহ ৫৮ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করেছি। তদন্তে যাদেরই সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদেরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। এই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। বিস্ফোরক আইনের মামলায় ৮৩৪ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। হত্যা মামলায় খালাস বা সাজাভোগ শেষে বিস্ফোরক মামলার কারণে মুক্তি আটকে যায় ৪৬৮ বিডিআর সদস্যের।

অন্যদিকে হত্যা মামলায় ৮৫০ জনের বিচার শেষ হয় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর। তাতে ১৫২ জনের ফাঁসি, ১৬০ জনের যাবজ্জীবন ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। খালাস পান ২৭৮ জন। ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর সেই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ও হয়ে যায় উচ্চ আদালতে। তাতে ১৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়।

যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয় ১৮৫ জনকে। আরও ২২৮ জনকে দেয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা। খালাস পান ২৮৩ জন। উচ্চ আদালতের রায়ের আগে ১৫ জনসহ সব মিলিয়ে ৫৪ জন আসামি মারা গেছেন। হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে ২২৬ জন আসামি আপিল ও লিভ টু আপিল করেছেন।

অন্যদিকে হাইকোর্টে ৮৩ জন আসামির খালাস এবং সাজা কমানোর রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এসব আপিল ও লিভ টু আপিল এখন শুনানির অপেক্ষায়। এই ঘটনার পর সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিডিআরের নাম বদলে যায়, পরিবর্তন আসে পোশাকেও। এ বাহিনীর নাম এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ