প্রকৃতিকথা
তিনটি গ্রামের বসন্ত প্রকৃতির গল্প
বসন্ত হলো এ দেশের প্রকৃতির জাগরণ কাল। শীতে শীর্ণ স্তব্ধ গাছপালায় লাগে নতুন পাতার উল্লাস, বনে বনে ছড়িয়ে পড়ে দলা দলা সবুজের আগুন। ফাল্গুন আর চৈত্র- এ দুই মাস হলো বাংলার বসন্ত। ফাল্গুন এলেই বাংলার প্রকৃতি যেন নতুন বউয়ের মতো সাজে। বসন্তের অন্তত তিনটি রূপ আমরা প্রকৃতিতে দেখতে পাই- নতুন পাতা, রঙিন ফুল ও কচি ফল। বনবসন্তে অরণ্যের গাছগাছালিতে ছড়িয়ে পড়ে পাতাঝরার গান আর পাতা ছাড়ার উন্মাদনা- শাল মেহগনি সেগুনের পাতা ঝরা, বনতলে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি, গাছের মিনারে বাজতে থাকে নতুন পাতার আগমনী সংগীত, সেই সঙ্গে পুষ্পকুঁড়ির উন্মেষ। শহুরে বসন্ত যেখানে পার্কে বা উদ্যানে না গেলে বুঝা যায় না যে প্রকৃতিতে বসন্ত এসে গেছে। পার্কের গাছপালায় ধরে নতুন কচি পাতা আর ফুল। মাধবী ফুল ফোটার সময়টাইতো বসন্ত। করবী আর কাঞ্চনের লালচে গোলাপি রং ছড়িয়ে পড়ে ডালে ডালে। তবে বসন্তের কাঁচা রূপ যেন ঢলে ঢলে পড়ে এ দেশের পল্লিপ্রকৃতিতে। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার ভাষায়-
‘বল কেমনে নিবাই সখি বুকের আগুন!
এল খুন-মাখা তৃণ নিয়ে খুনেরা ফাগুন’
সে যেন হানে হুল্খুনসুড়ি,
ফেটে পড়ে ফুলকুঁড়ি
আইবুড়ো আইবুড়ো
বুকে ধরে ঘুণ!
যত বিরহিনী নিম্খুন-কাটা ঘায়ে নুন!
আজ লাল-পানি পিয়ে দেখি সবকিছু চুর!
সবে আতর বিলায় বায়ু বাতাবি নেবুর!
হলো মাদার অশোক ঘাল,
রঙন তো নাজেহাল!
লালে লাল ডালে-ডাল
পলাশ, শিমুল।
সখি তাহাদের মধু ক্ষরে-মোরে বেঁধে হুল্!’
বসন্ত এলেই মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।’ বসন্ত এসে গেছে, ফাল্গুন শুরু হয়েছে আর ঘরের দরোজা খুলে সে রূপ দেখব না তাতো হয় না। রবীন্দ্রনাথের পর বসন্ত নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া আর কেউ এত বেশি মাতামাতি করেননি। সেই বসন্ত অগ্রজ ফাল্গুনের পল্লিপ্রকৃতির রূপ দর্শনে বেরিয়ে পড়লাম গাঁয়ের পথে। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরের এক গ্রাম ভুলবাড়িয়া। সকাল হতেই গাঁয়ের বুক চিরে পাকা পথ ধরে এগুতে থাকলাম। রাস্তার দুপাশে কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, বাড়িগুলোর পেছনে ও রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ বিল। লোনা মাটির খেতগুলো ফেটে চৌচির হয়ে আছে। বৃষ্টি হলে সবুজ হবে আমন ধানের গাছে। বিলগুলো এখন ফসলশূন্য, মাঠগুলো খোপ খোপ করে ঘিরে ফেলা হয়েছে মাটির দেয়াল তুলে, স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে বলে ঘের। ঘের হলো চিংড়ি ও মাছ চাষের জায়গা, ঘেরের মধ্যে কিনারে নালা মতো কেটে জলাধার বা গর্ত করে রাখা হয়েছে। এ সময় সেগুলোর মেরামতি কাজ চলছে। কেউ কেউ আবার সেসব জলাধারে জল আটকে বোরো ধানের কয়েকগুছি চারা লাগিয়েছে। বিস্তীর্ণ খাঁ খাঁ করা রতনপুর বিলের মধ্যে সেগুলো যেন এক টুকরো পট্টির মতো সবুজের আঁচল ফেলেছে।
ঘের আর বাড়ির অনেকগুলোরই বেড়া দেয়া হয়েছে কন্টকিত গাছ দিয়ে। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে বলে সিজগাছ, অন্য নাম বাজবরণ গাছ। কোনো কোনো গাছে ফুটেছে খুদে ফুল, ধরেছে ফল। এ গাছগুলোকে দেখে শুভলক্ষ্মী ঘোষের বাজবরণ গল্পটার কথা ভাবছিলাম। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ভালো-দাদু শিশু রাতুলকে ক্যাকটাসের একটি চারা উপহার দিয়ে বলেছিলেন, এ গাছ বাজের সঙ্গে যুদ্ধ করে। তাই বাড়িতে এ গাছ থাকলে সে বাড়িতে বাজ পড়ে না; কিন্তু সেই ভালো-দাদুরই একদিন মাথায় বাজ পড়ে মৃত্যু হয়েছিল। এ গাছের বাজবরণ নামটি কি করে হয়েছে জানা নেই, অন্য নাম নেড়িসিজ, তিক্তসিজ বা তেসরামনসা। গাছের যে অঙ্গটাই ভাঙা হোক না কেন, সেখান থেকে দুধের মতো ঘন আঠাল কষ ঝরে। কষটা সুবিধের না, ত্বকে লাগলে জ্বালাপোড়া করে, কাঁটার খোঁচাতেও যন্ত্রণা হয়। তাই দুষ্ট লোকদের ঠেকাতে ও গাঁয়ে এ গাছের জুড়ি নেই।
কোনো খরচ নেই, একবার পুঁতে দিলে তিরিশ-চল্লিশ বছর সেখানে পাহাড়াদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আস্তে আস্তে প্রধান কাণ্ডটা মোটা হতে হতে একসময় সুপারি গাছের মতো হয়ে যায়। বাজবরণ গাছটা ইউফরবিয়েসী গোত্রের; কিন্তু অনেকেই আমরা ওকে ক্যাকটাস বলে থাকি। ক্যাকটাস হলো ক্যাকটেসি গোত্রের গাছ। এ গোত্রের দুটি গাছ দেখলাম ও গাঁয়ে একটি ফণীমনসা বা ওপানশিয়া, অন্যটি মান্দাকারু বা হেজ ক্যাকটাস; কিন্তু গাঁয়ের লোকদের কাছে এ তিনটি গাছই সিজ বা সেজ নামে পরিচিত। ওদের তো আর বোটানির দরকার নেই, কাঁটাওয়ালা গাছ, তাই ওগুলো সিজ। ফণীমনসা গাছের চ্যাপটা পুরু সাপের ফণার মতো কাণ্ডে বুটি বুটি দাগ, কিনার থেকে কুঁড়ি বেরুচ্ছে; কিন্তু হেজ ক্যাকটাসে কোনো কুড়ি বা ফুল কিছুই নেই। এ গাছটির দেখা পেলাম পাশের চাঁদগড় গাঁয়ে। বাড়ির সীমানায় গাছগুলো এত লম্বা ও ঝোপাল যে তার কোনো কোনোটির মাথা ঘরের চাল ছাড়িয়ে গেছে।
গৃহকর্ত্রী মাহমুদা জানালেন, তার বিয়ে হয়েছে ২৩ বছর। তখন থেকেই এ গাছগুলো একই রকম দেখে আসছেন। লম্বা হয়, মাথা ঝড়ে ভাঙে, আবার বেড়ে ওঠে। গাছে শাপলা ফুলের মতো সাদা ফুল ফোটে; কিন্তু এ বসন্তে তার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। বিস্ময় লাগে, ব্রাজিলের এই গাছ কি করে শত বছর আগে বাংলার এমন এক অখ্যাত গাঁয়ে এসে নিবাস গেড়েছিল!
একটা বাড়ির পিছনে কয়েকটা মেহগনি গাছ- দুই রকমের, এক ধরনের মেহগনি পাতা ছোট, আর এক ধরনের পাতা বড়। সবগুলো গাছেই প্রায় একই রকম শক্ত কাঠের মতো বাদামি রঙের ফল রয়েছে আকাশের দিকে মুখ করে। কিছু ফল ফেটে ফালা ফালা হয়ে খোসা ঝরে পড়েছে মাটিতে, ফলের বোঁটার ওপর ঝুটি বেঁধে পাতলা বাদামি পাতের মতো বীজগুলো রয়ে গেছে। মেহগনি গাছের পাতাগুলো ঝরে গেছে, ডালে ডালে এখন কচি সবুজ পাতা গজিয়েছে। মেহগনির মতোই আর একটা গাছ রয়েছে, তার নাম লম্বুগাছ, কেউ কেউ বলেন সাদা মেহগনি। গাচটা আশপাশের সব গাছ ছাড়িয়ে যেন আকাশে উঠে গেছে, মাথার দিকে কয়েকটা ডালপালা। সেসব ডালে নতুন পাতার আহা কি রং! পাটল লাল রং ছড়িযে পড়েছে পাতায় পাতায়, যেন গাছে গাছে লেগেছে রক্তের ছোপ। আমেরিকায় ফল সিজনে মানে অটামে দেখেছি সরেল গাছের অমন রূপ। পার্থক্যটা হলো, আমেরিকায় ও গাছের পাতার রং বদলায় হেমন্তে পাতাঝরার কালে, আর বাংলাদেশে এ গাছের পাতার রং বদলায় বসন্তে পাতা গজানোর কালে।
শিমুলের ডাল, ফুলে ফুলে লালে লাল। শিমুলের সেসব নরম ডাল পেয়ে সেখানে তার ঘাড়ে চেপে বসেছে পরগাছা ধাইরা বা মান্দা। মেহগনি ও আমগাছেও আছে ওরা। সিসার মতো ভারি চওড়া পাতা ঝুলছে সে গাছে। কয়েকটা শ্বেতশিমুলের গাছও চোখে পড়ল সে গাঁয়ে। শ্বেতশিমুলের ডালগুলোয় কোনো পাতা নেই, ফুলও নেই। আছে থোকা ধরে লণ্ঠনের মতো ঝুলতে থাকা সবুজ ফল। শাখায় শাখায় নেচে বেড়াচ্ছে সবুজ টিয়ে আর নীল মাছরাঙা। ভোরবেলা শুনেছি কোকিলের ডাক। কিছুদিন আগেও বসন্তের আগমনে মাতাল হয়ে ফুটেছিল সাদা সাদা সজনে ফুল। নিষ্পত্র সেসব গাছ রয়েছে রাস্তার দুধারে প্রচুর। ডালে ডালে চিকন সবুজ কাঠির মতো ঝুলছে অজস্র সজনে ডাটা। ফুল ফোটা সজনে গাছগুলো যেন গাঁয়ের চেরি ফুল। মাঝে মাঝেই বাঁশবনের তলে চাপ চাপ আঁধারকে আলোময় করে সকালবেলায় প্যাগোডার চূড়ার মতো মঞ্জরিতে ফুটে রয়েছে অজস্র ভাট ফুল। সেখানে সুবাস ছড়াচ্ছে জীবনানন্দের ভাঁটফুল যেন ‘বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।’
অজস্র সাদা ব্রাশের মতো খুদে ফুল নিয়ে রূপবতী করে তুলেছে অসংখ্য খইয়া বাবলা গাছ। আর বাবলা গাছ ফুলশেষে যেন ধূসর সবুজ কচি ফলের অলংকার পড়েছে। সদ্য গজানো পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে মেঘ শিরিষের কাচা ফল। পত্রময় ডালে ডালে শোভা পাচ্ছে আমের মুকুল, কচি গুটি, লিচুর ফুল, জামরুলের কুড়ি, বাতাবি লেবু ফুলের আতরমাখা গন্ধ বিলাচ্ছে বসন্ত সৌরভ। শুকনো ডাঙ্গায় জিগাগাছ বেয়ে উঠে গেছে ফুল ফোটা বুনো কলমিলতা ও দুধিলতা। বুনো কলমির ফুলের রং হালকা বেগুনি, কেন্দ্রস্থল গাঢ় বেগুনি আর দুধিলতার ছোট ছোট পঞ্চপাপড়ির ফুলগুলোর রং ক্ষীরসাদা। রাংচিতা গাছেরও ডাল পাতা বাঙলে সাদা কষ ঝরে, ইউফরবিয়েসি গোত্রের এ গাছের কাণ্ড ডাটার মতো, পাতা নরম, পুরু ও চওড়া। সে গাছের ডগায় ডগায় শোভা পাচ্ছে খুদে পাখির মতো লাল ফুল, স্বর্ণরেণু যেন ঝরছে ফুলগুলোর মুখ থেকে। ওগুলো ফুলের পরাগরেণু।
চাঁদগড় থেকে গেলাম আক্রা গ্রামে। সে গ্রামেই যেন অপেক্ষা করছিল বসন্ত প্রকৃতির শেষ দৃশ্যের মঞ্চায়ন। যে পারিজাত ফুলকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যরে মাটিতে নিয়ে আসার জন্য ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল শ্রীকৃষ্ণ, সেই পারিজাত ফুলের দেখা পাব আক্রা গ্রামের দর্পনারায়ণ বিশ্বাসের বাড়ির পুকুর পাড়ে! একটা মা রাজহাঁস তার ছানা পোনাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পুকুরপাড়ে, উত্তরপাড়ে সিঁদুরলাল তোড়াধরা পারিজাত ফুল ফুটে রয়েছে। এ পাড়ে রয়েছে একটি রোশনাই জেল্লাই আষাঢ়ীলতার ঝোপ, শত শত হালকা গোলাপি ব্রাশের মতো ফুল ফুটে ভরে রয়েছে ঝোপটা। কাছাকাছি রয়েছে অনেকগুলো আকন্দ গাছ। এগুলোর মধ্যে একটি শ্বেতআকন্দ গাছ। সবগুলোরই নরম ডালের মাথায় ফুটে রয়েছে থোকা ধরা আকন্দ ফুল। ভীষণ ভেষজ গুণের গাছ লাল ও সাদা আকন্দ। জঙ্গলে ছেয়ে আছে ফলধরা ঘাগড়া ও হুদো ঘাসের ঝোপ। বাড়ির লোকেরা জানালেন, এ বাড়ির আদি পুরুষদের একজন কিছু কবিরাজি জানতেন। তিনি সে বাড়িতে বেশ কিছু কবিরাজি গাছ লাগিয়েছিলেন।
সবই শেষ হয়েছে, কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে রয়েছে এই তিনটে পরশ পিপুল গাছ। এ গ্রামে আর কোথাও পরশ পিপুল গাছ নেই, এ গাছ এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। গাছ তিনটের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, গোল গোল কাঁচা-পাকা প্রচুর ফল ঝুলছে। অনুরোধ করতেই জনৈক গ্রামবাসী গাছে চড়ে কিছু শুকনো পাকা ফল পেড়ে দিলেন। কোচা ভরে সেসব ফল নিয়ে চললাম ঢাকা। এবারের মিশন সেসব ফলের বীজ থেকে চারা তৈরি করে ঢাকা শহরে পরশ পিপুলের গাছ ছড়িয়ে দেয়া। কেননা, ঢাকা শহরে জানা মতে এখন একটি পরশ পিপুল গাছই স্থাপত্য অধিদপ্তরের সামনে টিকে আছে।
মৃত্যুঞ্জয় রায়: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে