টক অব দ্য কান্ট্রি ছাত্রদের নতুন দল
চা বিক্রেতা আব্দুল হালিমের বসবাস রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায়। ছোট্ট একটা দোকানে দিনভর তিনি চা-পান বিক্রি করেন। পেশাগত কারণেই প্রতিদিন তাকে মিশতে হয় বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে। কথা বলতে হয়, দিতে হয় আড্ডা। দেশের আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনাও হয় সেখানে। তবে সম্প্রতি আড্ডার-আলোচনায় সবকিছু ছাপিয়ে কারণে-অকারণে উঠে আসছে ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দলের প্রসঙ্গ।
আব্দুল হালিম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, সপ্তাহখানেক ধরে সবাই নতুন দল নিয়েই আলোচনা করছে বেশি। দলের নাম কি হবে, নেতা কে কে হলে ভালো হয়- সবাই এগুলো নিয়েই কথা বলেন।
আব্দুল হালিমের দোকানের মতোই নতুন রাজনৈতিক দলের আলোচনা জায়গা করে নিয়েছে করপোরেট দুনিয়ায়। ব্যাংকপাড়া খ্যাত রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত বিভিন্ন কোম্পানির ক্যান্টিনের টেবিল হচ্ছে সেই আলোচনার স্থান। অফিসের সাধারণ কর্মকর্তারা যেমন আলোচনা করছেন, বাদ যাচ্ছেন না বড় বসরাও।
রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারি) কথা হয় অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের পরিস্থিতি কেমন হওয়া দরকার ছিল সেই তর্ক-বিতর্ক চলেছে খুব। এখন প্রধান টপিক নতুন দল।
তিনি বলেন, একটু আগেই সহকর্মীদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল নাহিদ ইসলামদের দল নিয়ে। সব রাজনৈতিক দলই-তো মোটামুটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। নতুন দলে যারাই নেতৃত্বে আসুক তারা যেন অন্যদের মতো না হয় সবার চাওয়া এখন সেটাই।
শুধু কি রাজধানী? নতুন দলের আলোচনা ছড়িয়েছে ৬৮ হাজার গ্রামবাংলায়। কথা হয় রাজবাড়ীর বানিয়াবহ এলাকার অটোরিকশা চালক শরাফ মন্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ছাত্ররা রাজনৈতিক দল করছে তা সবাই বলাবলি করে। আমার অটোতে যেসব যাত্রী ওঠেন তারাও ঘুরেফিরে নতুন দলের কথা বলেন। নতুন দল আসছে এটা শুনে ভালোই লাগে।
জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতাদের সমন্বয়ে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি নাম চূড়ান্ত না হওয়া নতুন রাজনৈতিক দলটি আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ইতোমধ্যে দলের আহ্বায়ক-সদস্য সচিবসহ শীর্ষ ৯ পদে প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার পদ থেকে যে কোনো সময় পদত্যাগ করবেন নাহিদ ইসলাম। সদস্য সচিব হিসেবে থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সমাজকল্যাণ সম্পাদক মো. আখতার হোসেন। এছাড়াও শীর্ষ পদের আলোচনায় রয়েছেন সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আলী আহসান জুনায়েদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। নারী ও সংখ্যালঘু কোটায় গুরুত্বপূর্ণ পদের ভাবনায় রয়েছেন সামান্তা শারমিন ও অনীক রায়।
দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণ থেকে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে। ইতোমধ্যে গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ দফা প্রস্তুত করা হয়েছে, এটি সামনে রেখে যে কোনো সময় দলের ঘোষণা আসতে পারে।
এদিকে নতুন এই রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘিরে রাজধানী ঢাকায় বিশাল জমায়েতের পরিকল্পনা করছেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণরা। ২৮ ফেব্রুয়ারি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লক্ষাধিক লোক উপস্থিতি করার পরিকল্পনার কথাও জানা গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, ওই দিন সারা দেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিরা ঢাকায় আসবেন।
দলটির একটি সূত্র জানিয়েছে, অর্গানোগ্রাম, ঘোষণাপত্র, সময়সহ সবকিছু চূড়ান্ত হলে সংবাদ সম্মেলন করে আজ-কালের মধ্যে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা আছে।
সূত্র জানায়, এই দলে অনেকেই আছেন যারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। এখন পর্যন্ত দেশের প্রায় ৩০টি জেলা, চারটি মহানগরসহ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শাখাগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে তারাও উপস্থিত থাকবেন।
জানা গেছে, প্রথমে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটবে রাজনৈতিক দলের। এরপর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে কাউন্সিলের মাধ্যমে। আহ্বায়ক কমিটির পদপদবি নিয়ে কয়েকটি পক্ষের মধ্যে বিবাদ থাকলেও তা এখন অনেকটাই সমাধানের পথে। নতুন দলের কমিটির কাঠামোয় শীর্ষ চারটি পদ আহ্বায়ক, সদস্যসচিব, মুখ্য সংগঠক ও মুখপাত্র থাকবে বলে জানা গেছে।
এগুলোর সঙ্গে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব পদ তৈরি করা হতে পারে। শীর্ষ এসব পদে পর্যায়ক্রমে আলোচনায় আছেন নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আলী আহসান জুনায়েদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। নারী ও সংখ্যালঘু কোটায় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেন সামান্তা শারমিন ও অনীক রায়।
ছাত্রনেতাদের দাবি, ১২০ থেকে ১৫০ সদস্যবিশিষ্ট নতুন দলের জন্য ইতোমধ্যে ৭০ জনকে বাছাইসহ শীর্ষ ৯টি পদের জন্য ৯টি নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন ও সেক্টর থেকে অনেকে এ কমিটিতে ভিড়তে চাচ্ছেন। কমিটির আকারের তুলনায় অধিক প্রার্থী হওয়ায় নেতা বাছাইয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নতুন দলের আত্মপ্রকাশের আলোচনা টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হলেও এখনো দলের নামই ঘোষণা হয়নি। এমনকি নাম চূড়ান্ত হয়নি বলেও আলোচনা রয়েছে। ছাত্রনেতারা জানিয়েছেন, দলের জন্য কয়েকটি নামের প্রস্তাব উঠলেও এখনো তা চূড়ান্ত নয়। নেতাদের পছন্দের তালিকায় সম্ভাব্য ৯টি নাম রয়েছে। তবে ইংরেজিতে নামকরণের বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু নাম নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। সেগুলো হলো- ‘জাতীয় বিপ্লবী শক্তি’, ‘ছাত্র-জনতা পার্টি’, ‘বিপ্লবী জনতা সংগ্রাম পার্টি’ ও ‘বৈষম্যবিরোধী নাগরিক আন্দোলন’। এ ছাড়া নতুন দলের নির্বাচনী প্রতীক কী হবে তা নিয়েও জোর আলোচনা চলছে। এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য চারটি প্রতীক নিয়ে বেশি কথা হচ্ছে। সেগুলো হলো ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’, ‘হাতি’ ও ‘ইলিশ’।
নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের দল কবে আত্মপ্রকাশ করবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলার সুযোগ হয়নি। আমরা ২৬ ফেব্রুয়ারি ঘোষণার একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম। এখন পর্যন্ত ওইদিনটাই ঠিক আছে।
তবে নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেছেন, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা হবে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে