Views Bangladesh Logo

পর্দার আড়ালে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কৃতিত্ব

Mohshin  Habib

মহসীন হাবিব

ন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রে এক বিরল ঘটনা ঘটে গেছে এ বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার। ওইদিন যুক্তরাষ্ট্রের ওভাল অফিসে আলোচনায় বসেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদেমির জেলেনস্কি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যেখানে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিওসহ অনেক সাংবাদিক। কথা ছিল ওই মিটিঙের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেনের মধ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হবে ইউক্রেনের খনিজসম্পদ বিষয়ে; কিন্তু মিটিং চলাকালেই এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো যে এগ্রিমেন্ট তো দূরের কথা জেলেনস্কির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই কষ্টকর হয়ে উঠল। যে ভাষায় আলোচনা হয়েছে এবং যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখা গেছে তা চায়ের দোকান কিংবা পাব-এ হতে পারে; কিন্তু ওভাল অফিসের মতো একটি জায়গায় এই ‘ঝগড়া’ ছিল একেবারে অস্বাভাবিক। দুই দেশ অথবা দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের এমন ব্যত্যয় আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। এ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো হতভম্ব হয়ে গেছে। আমরাও হতভম্ব হয়েছি; কিন্তু ইউরোপের হতভম্ব হওয়া এবং আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর হতভম্ব হওয়ার মধ্যে একটি পার্থক্য আছে। সে কথায় একটু পরেই আসছি।

ঝগড়াপূর্ণ মিটিং শেষ হতেই জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউস স্টাফরা সাফ জানিয়ে দিলেন, মি. প্রেসিডেন্ট, আপনি এখন চলে যান। ডিনারটাও হলো না! এবং জেলেনস্কি কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই দ্রুত হোয়াইট হাউস ছেড়ে ইউরোপের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। তিনি এসেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং ব্রিটেন তাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অভ্যর্থনা দিল। কিং তৃতীয় চার্লস তাকে নরফোক বাসভবনের স্যানড্রিংহাম স্যালুনে অভ্যর্থনা জানিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক আলোচনা করলেন। ব্রিটেনের এই উষ্ণতার মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকেও জানিয়ে দেয়া হলো যে শুধু ব্রিটেনের সরকার নয়, স্বয়ং রাজাও জেলেনস্কি তথা ইউক্রেনকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন।

উল্লেখ্য, শুধু সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুসিক এবং হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ওরবান ছাড়া ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলো জেলেনস্কিকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং ইউকের সঙ্গে সমানভাবে তাল না মেলানোর যথেষ্ট যুক্তি আছে ওরবান এবং ভুসিকের হাতে। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হলেও নিকটতম প্রতিবেশী বিশাল রাশিয়ার সঙ্গে কোনো দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা চান না। বরং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তাদের একটি অবসেশন আছে। এই দুই প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত পলিটিক্যাল ইকোনমিস্ট জেফ্রি স্যাকসের দৃষ্টিভঙ্গির মতোই। স্যাকস মনে করেন, আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারের হাজার হাজার মাইল দূরের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা না করে, রাশিয়ার সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান তৈরি করা উচিত ইউরোপীয় দেশগুলোর। কারণ ভবিষ্যতের স্থায়ীভাবে তাদের রাশিয়ার পাশেই বসবাস করতে হবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যতই উগ্র বলে মনে করা হোক না কেন, তার আচার ব্যবহার যতই মুখরা হোক না কেন, তিনি যেসব কথা বলেন এবং সিদ্ধান্ত নেন তার পেছনে বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উচ্চস্বরেই বারবার জেলেনস্কির উদ্দেশ্যে বলেছেন, কার্ড আপনার হাতে না, আপনি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি নিচ্ছেন। প্রতি সপ্তাহে সুন্দর সুন্দর হাজার হাজার তরুণ নিহত হচ্ছে। এই যুদ্ধ বন্ধে আপনাকে আলোচনায় বসতে হবে।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বলে থাকেন, ‘আমি একজন জাতীয়তাবাদী, আমি একজন ব্যবসায়ী।’ তিনি এ যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করতে চান না। তিনি নির্বাচনের প্রচারণার সময় এবং নির্বাচিত হয়েও বারবার বলেছেন এবং এখনো বারবার বলছেন, ‘আমি ক্ষমতায় থাকলে এ যুদ্ধ শুরু হতো না।’ তিনি এ যুদ্ধের জন্য সরাসরি ডেমোক্র্যাট দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে দায়ী করছেন।

অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অবস্থানের পেছনে আরও কয়েকটি কারণ লুকানো আছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদেমির জেলেনস্কিকে শুরু থেকেই অপছন্দ করেন এবং তার প্রতি বিশেষ ক্ষোভ রয়েছে। সেই ক্ষোভেরও কারণ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ডেভোন আর্চার এবং জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেন রোসমন্ট সেনেকা পার্টনার্স নামে একটি বিনিয়োগ পরামর্শবিষয়ক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন ২০০৮ সালে। ২০১৪ সালে জো বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকতে ইউক্রেনের ধনকুবের মিকোলা স্লোচেভস্কির কোম্পানি বুরিশমায় জোগদান করেন ডেভোন আর্চার এবং হান্টার বাইডেন। বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের সদস্য হিসাবে তাদের বছরে ১ মিলিয়ন ডলার করে সম্মানী দেয়া হতে থাকে। এই বুরিশমা কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। পরবর্তীতে স্লোচেভস্কি ইউক্রেনের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কর্মকর্তাদের ৬ মিলিয়ন ডলার ঘুষ দেন তদন্ত স্থগিত করার জন্য। ২০১৫ সালে আর্চার স্লোচেভস্কি এবং হান্টার বাইডেন ওয়াশিংটন ডিসিতে ফোন করেন চাপ দেয়ার জন্য যাতে বুরিশমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া না হয়।

এদিকে ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ২০১৯ সালে জেলেনস্কি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচিত’ হন। জেলেনস্কি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প তাকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোন করেন এবং এক পর্যায়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে ওই মামলায় সঠিক তদন্ত করার জন্য জেলেনস্কিকে অনুরোধ করেন। জেলেনস্কিও তাকে কথা দেন যে সততার সঙ্গে তদন্ত রিপার্ট দেয়া হবে; কিন্তু ততদিনে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদও শেষ হওয়ার পথে। জেলেনস্কি বুঝতে পারেন যে সামনের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি ট্রাম্পের সে কথা রাখেননি। জেলেনস্কির অনুমান সঠিক হয় এবং জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পুরস্কার হিসেবে জেলেনস্কিকে প্রেসিডেন্ট বাইডেন সর্ববিষয়ে নিঃশর্ত সমর্থন দিতে থাকেন, যার ফলশ্রুতিতে ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হয় এবং ৩৫০ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেয়। বাইডেন পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কিছু তথ্য আমাদের জেনে রাখলে পুরো ইউক্রেন যুদ্ধ বুঝতে সুবিধা হবে।

২০১৫ সালে সেপ্টেম্বর মাসে রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্লাউস ইওয়ানিসকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ করেন জো বাইডেন। রোমানিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার ৫ সপ্তাহের মাথায় বাইডেন এবং তার সংশ্লিষ্ট ১৬টি অ্যাকাউন্টে রোমানিয়ার ধনকুবের গ্যাব্রিয়েল পপোভিসিউ ৩ মিলিয়ন ডলার জমা করেন। পপোভিসিউর বিরুদ্ধে রোমানিয়ায় ছিল সিরিয়াস করাপশন চার্জ। ২০১৪ সালের ২২ এপ্রিল কাজাকস্তানের একজন ধনকুবের কেনেস রাকিশেভ তার কোম্পানি নোভাটাস হোল্ডিংস থেকে হান্টার বাইডেনের প্রতিষ্ঠান রোসমন্ট সেনেকায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৩০০ ডলার ট্রান্সফার করেন। ঠিক পরের দিনই একই অ্যামাউন্ট রোসমন্ট থেকে একজন গাড়ি সরবরাহকারীর অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় হান্টার বাইডেনের জন্য একটি গাড়ি কিনতে। রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী নারী ইয়েলেনা বাতুরিনা ২০১৪ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে ডিনার করার পর হান্টার বাইডেন এবং আর্চারকে ৩.৫ মিলিয়ন ডলার দেন যা গোপন করা হয়েছিল বলে রিপাবলিকানদের অভিযোগ। ২০২২ সালে পুতিন ইউক্রেন আক্রমণের পর প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসন ২৪ হাজার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে রাশিয়ার প্রতি; কিন্তু এক সময়ের পুতিনের ঘনিষ্ঠ বাকুরিনার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি। বাতুরিনা বসবাস করেন অস্ট্রিয়ায়। চাইনিজ কোম্পানি স্টেট এনার্জি এইচকে লিমিটেডও বাইডেনের পরিবারকে ৩ মিলিয়ন ডলার প্রদান করে। তৃতীয় বিশ্বের স্টাইলে বাইডেন পরিবারে এভাবেই অর্থ সমাগম হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে বাইডেন প্রশাসন যে বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ করেছেন তা এখন প্রমাণিত, বহু ডকুমেন্টও বেরিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বের হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রেরই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।

আরও একটি বিষয় আমাদের লক্ষ্য করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে এই যুদ্ধে; কিন্তু ইউরোপের ব্যয়ের অধিকাংশই ঋণ হিসেবে দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বেশিরভাগ অর্থ দেয়া হয়েছে অনুদান হিসেবে। এই দুই পক্ষের ব্যয়িত অর্থের সবই প্রায় সামরিক খাতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন, এ দায় যুক্তরাষ্ট্র কেন নেবে?

পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমের প্রভাবে আমরা জেনে আসছি যে এই যুদ্ধ কেবলই রাশিয়ার সৃষ্ট; কিন্তু ঘটনা যে পুরোপুরি সত্য নয় তা ট্রাম্প বুঝতে পারেন। কেন পুতিন ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করেছিলেন? সে কি শুধুই আগ্রাসন? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা জানেন। সে সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাশিয়া সমর্থিত ভিক্টর ইউনোকোভিচ। ২০১৩ সালে পশ্চিমাদের সমর্থনে আন্দোলন শুরু হয় যা এখন মাইদান আন্দোলন বলে পরিচিত। ইউনোকোভিচ আন্দোলনকারীদের দাবি মানেন এবং সমঝোতা তৈরি হয়; কিন্তু পুলিশের নাম ভাঙিয়ে কে বা কারা জনগণের ওপর গুলি চালায়। কোথাও ছাদের ওপর থেকে আবার কোথাও রাস্তা থেকে ছাদের দিকে। এভাবে শতাধিক নিরীহ আন্দোলনকারী নিহত হয়। এই চরমপন্থিরা পুলিশের ওপরও গুলি নিক্ষেপ করে। যে কারণে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। তখন আন্দোলন জোরদার হতে থাকে এবং ইউনোকোভিচ ক্ষমতা ছেড়ে রাশিয়ায় পালিয়ে যান। কিয়েভের আদালতও ফরেনসিক পরীক্ষার ভিত্তিতে জানায় যে চরমপন্থিরা এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। পশ্চিমারা ইউনোকোভিচকে নামাতে মরিয়া হয়ে গিয়েছিল প্রধানত তিনি পশ্চিমাদের বাদ দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ঝুঁকে পড়েছিলেন।

ইউক্রেনের দনবাস, লুহানস্ক এই অঞ্চলগুলোতে আদিকাল থেকেই রুশ ভাষাভাষিদের বসবাস। প্রো-রাশিয়ান না, এমন সরকার এলেই এ অঞ্চলের মানুষের ওপর নেমে আসে অন্যায়-অবিচার। বহু ঘটনার প্রেক্ষিতে রাশিয়ার চাপে ২০১৫ সালে মিনস্ক-১ এবং মিন্স্ক-২ নামে সমঝোতা হয়। সে অনুযায়ী দনবাস অঞ্চলের সীমিত স্বায়ত্তশাসন পাওয়ার কথা। ভলোদমির জেলেনস্কি তার নির্বাচনের পূর্বে প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি নির্বাচিত হলে এই সমঝোতা কার্যকর করবেন; কিন্তু ২০১৯ সালে জেলেনস্কি নির্বাচিত হয়ে সমঝোতা কার্যকর তো দূরের কথা, তিনি এথনিক রাশিয়ানদের প্রতি বৈরী হয়ে ওঠেন এবং ন্যাটোর কাছ থেকে ভারী অস্ত্র ক্রয় করতে থাকেন। সেই সঙ্গে ন্যাটোতে যোগদানের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি চাপ দিতে থাকেন। ১৯৯১ সালে যখন রাশিয়া ভেঙে যায় তখনই কথা ছিল যে ন্যাটো আর পূর্ব দিকে সম্প্রসারিত করা হবে না; কিন্তু সে কথা না রেখে রাশিয়ার আশপাশের ছোট দেশগুলোকেও কালক্রমে ন্যাটোতে যোগদান করানো হয়। পুতিন সেগুলো ভালোচোখে দেখেননি; কিন্তু তার সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদান প্রশ্ন নিয়ে। জেলেনস্কি যখন পুরোপুরি পশ্চিমাদের কোলে উঠে বসেন এবং ওয়াদা বরখেলাপ করেন তখন পুতিন ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দনবাস অঞ্চলকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন এবং শান্তিরক্ষী হিসেবে রাশিয়ার সৈন্য মোতায়েন করেন। সেই সঙ্গে জেলেনস্কির ওপর চাপ প্রয়োগ করেন ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি ত্যাগ করতে। জেলেনস্কি তা অস্বীকার করলে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পুতিন ব্যাপক সৈন্য প্রবেশ করান এবং যুদ্ধ শুরু হয়।

এই যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাইডেন এবং ইউরোপ সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে আসছিল ইউক্রেনকে। বন্যার মতো আধুনিক সমরাস্ত্র প্রবেশ করেছে ইউক্রেনে। তথাপি শক্তিশালী রাশিয়া একের পর এক ইউক্রেনের অঞ্চল দখল করে নিয়েছেন এবং সারা বিশ্ব বুঝতে পেরেছে, এই যুদ্ধে পুতিন পরাজয়ের সম্মুখীন হলেই তিনি পরমাণু ওয়ারহেড ব্যবহার করবেন। রাশিয়ায় রয়েছে বিশ্বের সর্বাধিকসংখ্যক পরমাণু অস্ত্র। যুদ্ধে রাশিয়ারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে; কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ইউক্রেন তরুণ সম্প্রদায়ের কত সৈন্য নিহত হয়েছে তার হিসাব গণমাধ্যমে আসেনি। ইউক্রেন থেকে তরুণ যুবক বয়সের ছেলে ও মেয়েদের জোর করে টেনেহিঁচড়ে যুদ্ধের ময়দানে নেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে জার্মানি, পোল্যান্ড, ফ্রান্স এবং আফ্রিকা থেকে সৈন্যরা ইউক্রেন বাহিনীর পাশাপাশি যুদ্ধে সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

অন্যদিকে রাশিয়াও তার মিত্র উত্তর কোরিয়া, ইরান ও চীনের সহযোগিতা গ্রহণ করেছে। চীন অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়াকে চাঙা করে রেখেছে, উত্তর কোরিয়া সরাসরি সৈন্য ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে এবং ইরান ড্রোন দিয়ে সাহায্য করছে। এমন একটি অবস্থায় ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এ যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। তিনি এ কৃতিত্ব নিতে চান। সে সঙ্গে এ কথাও ঠিক ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার একটি বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন, পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। এতে যে ওই রাষ্ট্রপ্রধানদের ক্ষোভের পারদ কিছুটা নেমেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই বললে অযৌক্তিক হবে না যে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ায় এ যাত্রা বিশ্ব হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে রক্ষা পেল। ইতোমধ্যেই তিনি কিছু সফলতা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে ইউরোপ এবং ইউক্রেনের উপায় নেই যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা করে এ যুদ্ধ চালানোর। যতই ইউরোপ এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইচ্ছা করুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র সাড়া না দিলে তাদের সামর্থ্য নেই রাশিয়ার সঙ্গে কুলিয়ে ওঠার। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইউরোপ ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামরিক সমস্যায় পতিত হবে।

মহসীন হাবিব: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ