Views Bangladesh Logo

গ্রামে নিষিদ্ধ বাদ্যযন্ত্র

এ কেমন বাংলাদেশ?

বাদ্যযন্ত্র মানুষের প্রাচীন সঙ্গী। সুখে-দুঃখে মানুষ সুর সৃষ্টি করে। সেই সুর মানুষের মনকে কোমল করে। সুর এমনই অপূর্ব সৃষ্টি যা এক মুহূর্তে মানুষকে এই অসীম মহাজগতের সঙ্গে এক করে। সুরের প্রতি মানুষের এমনই সহজাত টান, দেখা যায় বাদ্যযন্ত্র না থাকলে হাতের কাছে যা থাকে, মাটি-পিতল-সিলভারের হাঁড়িপাতিল, বাঁশ-কাঠ-টিন দিয়েও মানুষ সুর সৃষ্টি করতে চায়। বাংলাদেশের মানুষও অনাদিকাল ধরের সুরের প্রতি তাদের প্রেম-ভালোবাসা দেখিয়েছে। যার কারণে দেখা যায় আজও দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের কদর। বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী ধারা লোকগান। আর এসব লোকগানের অবিচ্ছেদ্য অংশ ঢাক, ঢোল, খোল, ডুগি, নাল, কঙ্কন, একতারা, দোতারা, সারিন্দা ও বাংলা ঢোলসহ হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র। বাদ্যযন্ত্র-সুর-সংগীত কেবল ঐতিহ্যের অংশ নয়, অনেক ধর্মীয় সংস্কৃতিরও অংশ। এসব বাদ্যযন্ত্র যদি কোনো গ্রামে নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে ধরে নিতে হবে বাংলাদেশের সামনে ভয়ংকর বিপদ অপেক্ষা করছে।

এমনই এক দুঃখজনক খবর জানা গেল সংবাদমাধ্যমে। গতকাল মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ফলসী ইউনিয়নের একটি গ্রাম শড়াতলায়। এক সপ্তাহ ধরে গ্রামের দেয়ালে দেয়ালে একটি নোটিশ দেখা যাচ্ছে। এতে লেখা, শড়াতলা গ্রামে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র ও হকার নিষিদ্ধ। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও গ্রামটিতে ঢুকতে পারবেন না। এই নিয়ম অমান্য করলে গুনতে হবে জরিমানা। সমাজপতিদের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ জেলা-উপজেলার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ।

নোটিশে উল্লেখ রয়েছে, ‘যেহেতু আমাদের গ্রামের ৯৫% মানুষ শিক্ষিত ও ২০ জনের মতো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী আছে। নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে গ্রামবাসী এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।’ নোটিশের শেষ অংশে গ্রামবাসীর পক্ষে ১৮ জন সই করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি, শিক্ষক, ইমাম ও সমাজসেবক।

বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করে নোটিশ সাঁটানোর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে এ নিয়ে সমালোচনা করছেন। গতকাল একজন নিজের ফেসবুক আইডিতে এ বিষয়ে পোস্ট করেন। সেখানে মন্তব্যের ঘরে একজন লিখেছেন, ‘প্রতিটি গ্রামে-শহরে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা রয়েছে। গুটিকয়েক মানুষ আইনবহির্ভূত কাজ করবে, এটা হতে পারে না।’ নোটিশে সই করা শড়াতলা গ্রামের পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি বলেন, আগে গ্রামে উচ্চ স্বরে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো। এতে অসুস্থ মানুষ, শিক্ষার্থী, নারী, শিশুসহ অনেকের সমস্যা হতো। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বিভিন্ন সময়ে উচ্চ স্বরে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নাচ-গান করে। এতে মানুষের সমস্যা হয়। তারা ও হকাররা নানা সময়ে মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।NN
উচ্চ শব্দে বাদ্যযন্ত্র বাজালে অবশ্যই অনেকের সমস্যা হতে পারে। তাই বলে একেবারে বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করে দেয়া হবে? তা ছাড়া এই নিয়ম কি কেবল হকারদের জন্য প্রয়োজ্য না কি সংগীতশিল্পীদের জন্যও বলবৎ থাকবে তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাতে করে সমাজে এক ধরনের নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়বে। শড়াতলা গ্রামের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্যান্য গ্রামেও হয়তো এ ধরনের কার্যক্রম শুরু হবে শিগগিরই। তাতে সংগীতশিল্পীরা যেমন বিপদে পড়বেন তেমনি করে সনাতন ধর্মের মানুষও বিপাকে পড়বেন, কারণ সুর-বাদ্য তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ।

নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পথনাটক এবং গানবাজনার মাধ্যমে মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের ভূমিকা রয়েছে।  এলাকা থেকে কেউ বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করতে পারে না। এটা বেআইনি। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে।

আমরা চাই পরিস্থিতি সরেজমিন তদন্ত করে প্রশাসন উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। তা ছাড়া ঘটনাটি আসলেই কী তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়াও জরুরি। আমরা সমাজের কোনো মোড়ল-মুরুব্বির এ ক্ষেত্রে নাকগলানো চাই না, চাই প্রশাসনের হস্তক্ষেপ। একটা কথা মনে রাখতে হবে, আমাদের বাংলাদেশ এখনো এতটা রক্ষণশীল হয়ে যাইনি যে, যে কোনো অজুহাতে একটা গ্রামে বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করে দেয়া হবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ