পুতিন কি পোল্যান্ড আক্রমণ করবেন
ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর থেকেই পোল্যান্ডকে হুমকি দিয়ে আসছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ২০২২ সাল থেকেই পোল্যান্ড রাশিয়ার সম্ভাব্য ভয়ে তটস্থ। তখন থেকেই অনেকে বলে আসছে, রাশিয়ার পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হতে পারে। অনেকে আবার এও বলছেন, পূর্ব-ইউরোপ নিয়ে পশ্চিম ইউরোপের তেমন মাথাব্যথা নেই; কিন্তু এ কথাও সত্য যে, পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার মূল দ্বন্দ্ব মূলত পূর্ব-ইউরোপ নিয়েই। তার অনেক কারণও আছে, আজকের পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তারা অনেকে স্বাধীন হয়েছে; কিন্তু রাশিয়া তাদের অনেককে পিছু ছাড়ছে না, যার কারণে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ করা।
পোল্যান্ড সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল না, স্বাধীন দেশ হিসেবেই তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র ছিল। পোল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দেয় ১৯৯৯ সালে। ১৯৯৯ সালেই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুতিন প্রেসিডেন্ট হন, পরের বছর ২০০০ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। পঞ্চম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২৫ বছর ধরে রাশিয়ার ক্ষমতায় রয়েছেন পুতিন। সোভিয়েত স্বৈরশাসক জোসেফ স্তালিনের পর এত লম্বা সময় ধরে কেউ রাশিয়াকে শাসন করেননি। পুতিনের বয়স এখন ৭৩, ১৯৫২ সালে জন্ম তার; সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে তিনি ২০৩৬ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকবেন এমন ব্যবস্থা মোটামুটি পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন। অন্তত রাশিয়ার মধ্যে তাকে এ ক্ষেত্রে বাধা দেয়ার আর কেউ নেই বললেই চলে।
ক্ষমতায় অধিগ্রহণের পর থেকেই পুতিনের স্বপ্ন রাশিয়াকে আবার সেরাদের কাতারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ সোভিয়েত আমলে নিয়ে যাওয়া, যখন পৃথিবীর ক্ষমতা ছিল দুই গোলার্ধ বিভক্ত; একপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরেকপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত রাশিয়া পতনের পর রাশিয়াকে আর কেউ গুনেই দেখেনি, গত ২৫ বছরে পুতিন রাশিয়াকে অনেকটাই সেই অবস্থা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়েছিল, পুতিনের উত্থান পৃথিবীকে আবার ক্ষমতার এক নতুন ভারসাম্যে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।
কিন্তু পুতিনের জন্য এখন গলার কাঁটা হয়ে গেছে অনেকটা পোল্যান্ড। কারণ, ইউক্রেনের হাত ধরে না পারলেও পোল্যান্ডের হাত ধরে ন্যাটো এখন রাশিয়ার ওপর ছড়ি ঘুরাতে চেষ্টা করছে। ইউক্রেনের অধিকাংশ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে পোল্যান্ডে। পোল্যান্ডের মাধ্যমে পশ্চিমারা রাশিয়াকে চারপাশ থেকে পরিবেষ্টিত করে তুলেছে বলে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন পুতিন। নিজ দেশের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে পশ্চিমা দেশগুলো; কিন্তু এটা এখন পুতিনের জন্য একটা স্পর্শকাতর বিষয়।
পোল্যান্ডের জন্যও বিষয়টি কম অস্বস্তির নয়। অস্বস্তি বা স্পর্শকাতরতার চেয়ে নিরাপত্তাহীনতার অভাব বলাটাই সংগত। নিরাপত্তাহীনতার অভাব থেকেই পূর্ব-ইউরোপে বড় ধরনের একটি যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। যদিও ট্রাম্পের উদ্যোগে, নরম-গরম বক্তব্যে ইউক্রেনে সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পুতিন; কিন্তু ন্যাটোর আপত্তিতে সেসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হবে, তাও দেখার বিষয়। পূর্ব-ইউরোপে যে স্থায়ী শান্তি সহসা ফিরবে না, তা বলা যায়।
ফলে পোল্যান্ডের উদ্বিগ্নতাও স্বাভাবিক, যার কারণে পুতিন পোল্যান্ডে সামরিক অভিযান চালাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। তাই তিনি পোল্যান্ডের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও সক্ষম পুরুষকে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। টাস্ক জানান, রাশিয়ার সেনাসংখ্যা ১৩ লাখেরও বেশি। তাদের ঠেকাতে নিয়মিত এবং সংরক্ষিত বাহিনী মিলে অন্তত ৫ লাখের বাহিনী গড়তে চান তিনি। এর পরেই তার মন্তব্য, ‘আমরা এই বছরের শেষ নাগাদ এমন একটি মডেল তৈরি করতে চাই, যাতে পোল্যান্ডের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকে এবং আমাদের রিজার্ভ বাহিনী সম্ভাব্য হুমকির মোকাবিলায় যথেষ্ট সক্ষম হয়।’
শুধু তাই নয়, ডোনাল্ড টাস্ক এখন পরমাণু সক্ষমতা-সম্পন্ন অস্ত্রও চান। পশ্চিম ইউরোপকে তিনি এখন আরও বেশি করে পাশে চাচ্ছেন। পুতিন পোল্যান্ড আক্রমণ করবে কি না, আমরা এখনো জানি না। ইউক্রেন আক্রমণ যতটা সহজ ছিল, পুতিনের জন্য পোল্যান্ড আক্রমণ করলে বিষয়টি তত সহজ হবে না। ন্যাটোকে তখন বাধ্য হয়েই সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে হবে। তাহলে অনিবার্যভাবেই এই যুদ্ধ রূপ নেবে খুব বড় ধরনের যুদ্ধে। হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে!
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে