Views Bangladesh Logo

প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর পশ্চিমাদের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করবে কি না!

ন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস আগামী ২৬ মার্চ ৪ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাচ্ছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই ড. মোহাম্মদ ইউনূসের প্রথম দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর। কাজেই এই সফর নানা কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই সফর আমাদের দেশের ভূরাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চীনকে ঘেরাও করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের তৎপরতা প্রত্যক্ষ করা যায়। সেই তৎপরতা অব্যাহত আছে। আমেরিকার উদ্যোগে কোয়াড গঠিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত জোট কোয়াডে আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বলা হচ্ছে, কোয়াড তার সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করবে। দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে, চীন, কানাডা এবং ব্রাজিলের আমদানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপ করা হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বাণিজ্য যুদ্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনা পণ্যের আধিপত্য খর্ব করা। অনেকদিন ধরেই চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সংঘাত চলছে। ট্রাম্পের সময় তা আরও ব্যাপকতা লাভ করেছে।

বর্ণিত পটভূমিতে আমাদের দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাচ্ছেন। ড. মোহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের বিষয়ে চীনের বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা ড. মোহাম্মদ ইউনূসের জন্য বিশেষ প্লেন পাঠাবে। এ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, চীন ড. মোহাম্মদ ইউনূসের এই প্রস্তাবিত সফরের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। বাংলাদেশে চীনের প্রচুর পরিমাণ বিনিয়োগ আছে। তারা আমাদের উন্নয়ন কাজে সহায়তা করছে। চীনের বিভিন্ন ধরনের পণ্যদ্রব্য আমাদের দেশে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ এক সময় ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ পণ্য আমদানি করত। বর্তমানে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান সবার শীর্ষে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশ-ভারতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৪৬ ট্রিলিয়ন টাকা। ওই বছর বাংলাদেশের মোট আমদানি বাণিজ্যে চীনের অংশীদারত্ব বৃদ্ধি পায় ১৫ দশমিক ১৭। আর বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্য হ্রাস পায় ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৬৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য চীনে রপ্তানি করে। এর বিপরীতে চীন থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে ২২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। এই বাস্তবতায় ড. মোহাম্মদ ইউনূস চীন সফরে যাচ্ছেন।

ড. মোহাম্মদ ইউনূস মূলত পশ্চিমা ব্লকের লোক। তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং উদারনৈতিক অর্থনীতিতে বিশ্বাসী; কিন্তু চীন সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে বিশ্বাসী। কাজেই অর্থনৈতিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে চীনের সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলার জন্য চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে ব্রিকস গঠিত হয়েছে। পরবর্তীতে এই জোটে আরো কয়েকটি দেশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দিন দিন ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে ব্রিকস এখন একটি শক্তিশালী জোটে পরিণত হতে চলেছে। ব্রিকস চাচ্ছে তাদের জন্য নতুন মুদ্রা চালু করতে। ব্রিকস যদি নতুন একক মুদ্রা চালু করতে পারে সেটা মার্কিন ডলারের অধিপত্য খর্ব করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চাইতে পারে না বিশ্বব্যাপী মার্কিন ডলারের অধিপত্য খর্ব হোক। এই অবস্থায় আগামীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন, রাশিয়া ইত্যাদি দেশের প্রতিযোগিতা বা বিরোধ আরও বেড়ে যেতে পারে। চীন ও রাশিয়ার উদ্যোগে ব্রিকস গঠনের ফলে পশ্চিমা আধিপত্য খর্ব হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের ক্রমবর্ধমান বিকাশ রোধ করার জন্য চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। ব্রিকসের উদ্যোগে নতুন একক মুদ্রা প্রচলনের উদ্যোগ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশগুলোর মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

কৌশলগত কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে। কারণ চীনকে মোকাবিলা করার জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সমর্থন পাওয়া খুবই জরুরি। বাইডেন প্রশাসন এবং ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সুসম্পর্ক বজায় ছিল। ড. মোহাম্মদ ইউনূস সামাজিক ব্যবসায় নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিল ক্লিনটন এবং ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ইউনূসের সামাজিক ব্যবসায় সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের টেকনিক্যাল সম্পর্ক হয়তো কিছুটা হতে পারে; কিন্তু চীন সফরের কারণে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের মূল যে জায়গা পশ্চিমা বিশ্ব তাদের সঙ্গে কোনো সংঘাত সৃষ্টি করবে কি না সেটাই দেখার বিষয়। চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন ঘটাতে গিয়ে নিশ্চয়ই ড. মোহাম্মদ ইউনূস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চাইবেন না। দেখতে হবে ড. মোহাম্মদ ইউনূসের চীন সফল বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থায় কেমন প্রভাব ফেলবে।

ড. ইউনূসের চীন সফরের সঙ্গে মিয়ানমার ইস্যুও জড়িত রয়েছে। মিয়ানমার একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে। বাংলাদেশের বর্ডারে আরাকান আর্মি বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের প্রায় ২০০ কিলোমিটার বর্ডার রয়েছে। এই বিশাল বর্ডার এরিয়া আরাকান আর্মির হাতে চলে গেছে। আরাকান আর্মি মিয়ানমার জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আরাকান রাজ্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি স্থান চলে গেছে আরাকান আর্মির দখলে। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বাংলাদেশ সফরকালে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। আরাকান রাজ্যে ভারতের বিনিয়োগ আছে। চীনের বিনিয়োগ রয়েছে। অর্থাৎ আরাকান রাজ্যে চতুর্মুখি সংকট বিরাজ করছে। শোনা যায়, আরাকান আর্মির ওপর চীনের প্রভাব বেশি। আরাকান বাংলাদেশের সীমান্তের নিকটবর্তী।

বাংলাদেশের সঙ্গে আরকান রাজ্যের সাংস্কৃতির যোগাযোগও আছে। নৃতাত্ত্বিক সম্পর্কও রয়েছে। এক সময় গোটা চট্টগ্রাম এবং সদ্বীপ পর্যন্ত আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরাকানের ঘটনা প্রবাহ আমাদের রাজনীতির সঙ্গে কিছুটা হলেও সম্পর্কিত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন হয়েছে তার নিজস্ব অপকর্মের কারণে; কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে কিছুটা হলেও ভূমিকা ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সম্পৃক্ততার কথা যতই অস্বীকার করুক না কেন সেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না। শেখ হাসিনা পতনের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার পতনের জন্য যে ভূমিকা পালন করেছে সেটা কি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য করেছে নাকি তার নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থে করেছে তা পরবর্তীতে বুঝা যাবে। মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আলাদা ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনা থাকতে পারে। যদি সত্যি তেমন কিছু থাকে তাহলে সেটা আমাদের দেশের জন্য বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। সেটা হলে তা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হবে।

আমরা গণতন্ত্র চাই। দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য বারবার ত্যাগ স্বীকার করেছে। কোনো কারণেই বাংলাদেশে অশান্তি সৃষ্টি হোক। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করুক এটা আমরা চাই না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির মূল উপজীব্য হচ্ছে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’। বাস্তব জীবনে আমরা সেই নীতির সঠিক বাস্তবায়ন ঘটাতে চাই। আমরা যে কোনো মূল্যেই হোক স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চাই। ভূরাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ কোনো বাইরের শক্তির ক্রীড়নক বা সেবাদাসে পরিণত হতে চাই না। পুরো বিশ্বে শাস্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিরাজ করুক এটাই আমাদের কামনা। চীনকে ঘোরাও করতে হবে কেন? চীনসহ অন্য যে কোনো দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা চলুক। কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি আমাদের কাম্য হতে পারে না। বাণিজ্য-বিনিয়োগ বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে দমনমূলক নীতি গ্রহণ করা যাবে না। প্রতিযোগিতা হতে হবে শান্তিপূর্ণ। আমরা উন্নয়ন অর্জন করবো কিন্তু অন্যের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে বিঘ্নিত করব কেন?

মোহাম্মদ শাহ আলম: রাজনীতিবিদ ও সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
অনুলিখন: এম এ খালেক

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ